নওগাঁ জেলায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কালো সৈনিক পোকা, যা একটি পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী প্রোটিন উৎস। এই পোকাটির লার্ভা মাছ ও হাঁস-মুরগির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে চাষিরা খাদ্য উৎপাদনের খরচ খুবই কমিয়ে আনতে পারছেন। বর্তমানে জেলায় কমপক্ষে ১০ জন উদ্যোক্তা এই পোকা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে থাকেন, যেখানে সঠিক প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পেলে এই খাতটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কালো সৈনিক পোকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি উৎপাদনের জন্য আলাদা দানাদার খাদ্যের প্রয়োজন হয় না। এর জন্য পচনশীল ফলমূল, শাকসবজি, বাজারের উচ্ছিষ্ট ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে সহজেই লার্ভা উৎপাদন করা সম্ভব। এর ফলে যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হয়, তেমনি এটি কম্পোস্ট তৈরিতেও সাহায্য করে। সাধারণত আলো-বাতাস চলাচল করে এমন জালের ঘেরা স্থানে এই পোকাগুলো রাখছিল। প্রজননের সময় ডিম পাড়ে কাঠের স্তর বা নির্দিষ্ট স্থানে। ডিম থেকে লার্ভা বের হলে তা আলাদা করে জৈব বর্জ্যের ওপর লালনপালন করা হয়। পাঁচটি ধাপ পেরিয়ে প্রায় ১৫-১৬ দিনের মধ্যেই এই লার্ভা মাছ ও হাঁস-মুরগির খাওয়ার উপযোগী হয়ে দাঁড়ায়।
নওগাঁর রানীনগর উপজেলার লোহাচুড়া গ্রামের প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তা নাহিদ আক্তার নয়ন এই পোকা উৎপাদনের সঙ্গে দেড় বছর আগে পরিচিত হন, যখন তিনি একটি বেসরকারি সংস্থা ‘মৌসুমী’ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এই উদ্যোগ শুরু করেন। তিনি জানান, প্রতি কেজি লার্ভা উৎপাদনে তাঁর খরচ প্রায় ১৫ টাকা এবং বিক্রি করেন ৬০ টাকায়। নিজের পুকুরের মাছের চালান চালানে দিয়ে মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা উপার্জন করেন তিনি, যা মাছের খাদ্য খরচে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় এনে দিয়েছে। এর পাশাপাশি তাঁর খামারে একজনের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে।
মাছ চাষি দেলোয়ার হোসেন বলছেন, দানাদার ফিডের মূল্য বৃদ্ধির কারণে জীববৈচিত্র্য ও লাভজনকতা বাড়ানোর জন্য বিকল্প খুঁজে পাওয়া জরুরি। তিনি আশাবাদী, কালো সৈনিক পোকার লার্ভা কম খরচে পাওয়া গেলে তা মাছ ও মুরগির খাদ্য হিসেবে খুবই উপকারী হবে এবং তাঁদের স্বাস্থ্যে উন্নতি আসবে।
উলিপুর গ্রামের আহসান হাবিব বলেন, বাজারে ফিডের দাম ৬০-৬৫ টাকা কেজি হওয়ায় মাছ চাষের খরচ বেড়ে গিয়েছিল। ২০১৯ সালে ইউটিউব থেকে ভিডিও দেখে পরিবেশবান্ধব এই পোকা উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে তিনি নিজে ছোট পরিসরে মাসে এক থেকে দেড় মণ লার্ভা উৎপাদন শুরু করেন। পরবর্তীতে সরকারি আর্থিক সহায়তা পেয়ে তিনি খামার বিস্তার করেন এবং এখন নিজের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে সেই সঙ্গে অতিরিক্ত লার্ভা বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কালো সৈনিক পোকা উৎপাদন পরিবেশ দূষণ কমাতে সহায়তা করে, পাশাপাশি ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণও হ্রাস করে। এই লার্ভা দ্রুত পচনশীল জৈব বর্জ্যকে কার্যকরী সম্পদে রূপান্তর করতে সাহায্য করে।
‘মৌসুমী’ সংস্থার ফিল্ড অফিসার সাইদুর রহমান জানান, মাছ চাষে খরচ কমানো ও স্বাস্থ্যসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিতের জন্য চাষিদের এই পোকা চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে জেলার বিভিন্ন উপজেলাতে সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. বায়েজিদ আলম বলেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ প্রদান অব্যাহত রয়েছে। বেকার যুব ও যুবতীরা এই খাতে যুক্ত হলে তারা আত্মকর্মসংস্থান লাভের সুযোগ পাবেন।
সব মিলিয়ে, সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যয়, পরিবেশের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ এবং প্রোটিনের বিকল্প উৎস হিসেবে কালো সৈনিক পোকা নওগাঁয় মাছ চাষের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। যথাযথ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ বাড়ালে এই উদ্যোগ জেলার অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।





