বৃহস্পতিবার, ১২ই মার্চ, ২০২৬, ২৭শে ফাল্গুন, ১৪৩২

গঙ্গাচড়ায় তিস্তা বাঁধ সংস্কারে অনিয়মের অভিযোগ, এমপি ও ইউএনও’র তদন্তান্তর

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় তিস্তা নদীর বাঁধের সংস্কার ও শোভাবর্ধন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মাটির বদলে বালুর ব্যবহার, বাঁধের নিচ থেকে মাটি কেটে ভরাট, শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন এবং নির্ধারিত প্রস্থের চেয়ে কমে যাওয়ার মতো নানান অনিয়ম চলছিল। তারা বলেন, এই অনিয়মগুলো বাঁধের স্থায়িত্বই কমিয়ে দিচ্ছে, যা ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে বসন্তের বর্ষায় পানি প্রবাহের ক্ষেত্রেও।

গত ৫ মার্চ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত সংবাদে বিষয়টি প্রকাশের পর এই অভিযোগগুলো প্রশাসনের নজরে আসে। এর পরে রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী ও গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা বাঁধের বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে অভিযোগ সংগ্রহ করেন।

এসময় স্থানীয় চেয়ারম্যান আশরাফ আলী, খতিবর আলী, ওহেদ আলী ও আজহারুল ইসলামসহ বেশ কিছু ব্যক্তি অযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, চর ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (UNDP) অর্থায়নে এই বাঁধের সংস্কার কাজ চলছে। তবে দরপত্র অনুযায়ী ৭০ শতাংশ মাটি ও ৩০ শতাংশ বালুর মিশ্রণের কথা থাকলেও, বেশির ভাগ স্থানে শুধুমাত্র বালু ব্যবহৃত হচ্ছে বলেই স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি। এর ফলে বাঁধের টেকসইতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগের ভিত্তিতে, কাজের শুরুতেই শ্যালো মেশিন দিয়ে নদীতে মাটি উত্তোলন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসন অবৈধ মাটি উত্তোলনের জন্য ঠিকাদারকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। তাছাড়াও, এস্কেভেটর মেশিন দিয়ে বাঁধের পাদদেশ থেকে মাটি কেটে উপরে ভরাট করার কারণে বাঁধের নিচে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, যা বর্ষা মৌসুমে ধসের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তথ্যমতে, দরপত্রে বাঁধের প্রস্থ ১৪ ফুট নির্ধারিত থাকলেও অনেক স্থানে তা কমে ১০ ফুটে আনা হয়েছে। এতে স্বাভাবิก চলাচলে সমস্যা দেখা দিয়েছে। কাজের স্থানেও কোনও সাইনবোর্ড না থাকায় ব্যয়, সময় ও বাস্তবায়নের তথ্য সাধারণ মানুষের জানা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, “বাঁধের নিচ থেকে মাটি কেটে উপরে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে নিচে বড় বড় গর্ত হয়ে গেছে। শুধু বালু দিয়ে কাজ করলে কতদিন টিকবে তা নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় রয়েছি।” আরেকজন বলেন, “দরপত্রে ১৪ ফুট রাস্তার কথা থাকলেও অনেক স্থানে তা ১০ ফুটে করা হয়েছে। এর ফলে চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।”

গৃহিণী রহিমা বেগম তার ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, “বর্ষায় পানি বাড়লে যদি বাঁধ ভেঙে যায়, তবে আমাদের ঘরবাড়ি ডুবে যাবে। এ বিষয়ে সময়মতো যদি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।”

একজন কৃষক রফিকুল ইসলাম (৬৫) অভিযোগ করেন, “আশরাফ চেয়ারম্যান, খতিবর আলী, ওহেদ আলী ও আজহারুল ইসলাম এতদিন এই কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আশরাফ চেয়ারম্যান ও খতিবর আলীর নেতৃত্বেই বালু উত্তোলন ও বাঁধের কাজ চলছে।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান আশরাফ আলী বলেন, “আমার কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই। এই কাজটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করছে। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।” তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উপজেলা ইউএনও জেসমিন আক্তার বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পরে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিদর্শন করেছি। স্থানীয়দের কাছ থেকে এ ধরনের অভিযোগ জানতে পেরেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, “চর ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় এই বাঁধের খালাখন্দ মেরামত ও ঘাস লাগানোর কাজ চলছে। অনিয়মের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে, রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী বলেন, “তিস্তা বাঁধের কাজ প্রতিনিয়ত তত্ত্বাবধানে থাকছে। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা নিম্নমানের কাজ সহ্য করা হবে না। আমরা অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাজের মান নিশ্চিত করা হবে।”

স্থানীয় বাসিন্দারাও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের শাস্তি না দিলে, আসন্ন বর্ষার মৌসুমে এই এলাকার অনেক জনপদ বড় বিপদের মুখোমুখি হতে পারে।

পোস্টটি শেয়ার করুন