মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা রক্ষায় মার্কিন
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক সহায়তার আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে
ইউরোপের তিন শক্তিশালী দেশ ব্রিটেন, জার্মানি ও গ্রিস। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে
সামরিক জোটে অংশগ্রহণের জন্য প্রবল চাপ এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রচ্ছন্ন হুমকি
থাকা সত্ত্বেও দেশগুলো সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এই অঞ্চলে কোনো ধরনের বৃহত্তর
যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে ইচ্ছুক নয়। ট্রাম্পের এই আহ্বানে মিত্র দেশগুলোর এমন নেতিবাচক
প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের একক আধিপত্যের ক্ষেত্রে এক বড়
চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে,
যুক্তরাজ্য কোনোভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের অংশ হবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প
সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছিলেন যে, মিত্র দেশগুলো যদি এই অঞ্চলে সামরিক সহায়তা না
দেয়, তবে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ট্রাম্পের এই
হুমকির জবাবে স্টারমার বলেন, এই মুহূর্তে ব্রিটিশ সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হলো ওই
অঞ্চলে অবস্থানরত নিজ দেশের নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং মিত্রদের জানমাল
রক্ষা করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্রিটেন নিজেকে কোনো ব্যাপক সংঘাতের অংশ হতে দেবে
না, বরং ওই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ
সমাধানের লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাবে।
একই সুরে সুর মিলিয়ে জার্মানিও এই সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে
দিয়েছে। জার্মান সরকারের একজন মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ইরানের সাথে
চলমান উত্তেজনার সাথে ন্যাটোর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। জার্মানি এই যুদ্ধে
কোনো পক্ষ নেবে না এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার কোনো
অভিযানেও তাদের নৌবাহিনী যোগ দেবে না। জার্মান প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা
হয়েছে যে, যতদিন এই সংঘাত চলবে, ততদিন তারা সামরিক তৎপরতা থেকে নিজেদের দূরে রাখবে
এবং কেবল শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংকট উত্তরণের পথ খুঁজবে।
অন্যদিকে, গ্রিসও এই ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। গ্রিক সরকারের
মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিস জানিয়েছেন, তার দেশ হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের সামরিক
অভিযানে জড়াবে না। ইউরোপীয় এই দেশগুলোর এমন সমন্বিত অবস্থান মূলত প্রেসিডেন্ট
ট্রাম্পের ওপর এক ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন যখন মিত্রদের
ওপর দায়ভার চাপিয়ে এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সংকুচিত করতে চাইছে, তখন
ইউরোপীয় শক্তিগুলোর এই ‘না’ বলা ওয়াশিংটনের জন্য বড় এক কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা
হচ্ছে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারের সিংহভাগ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়, ফলে
এই অঞ্চলের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প
এই অজুহাতে মিত্রদের কাছ থেকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা আদায় করতে চাইলেও ব্রিটেন,
জার্মানি ও গ্রিসের এই কঠোর অবস্থান প্রমাণ করে যে, ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজেদের
পররাষ্ট্র নীতিতে আরও স্বাধীন ও সতর্ক। এই পরিস্থিতির ফলে ভবিষ্যতে মার্কিন-ইউরোপীয়
সম্পর্ক এবং ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ সংহতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
বিশেষ করে ট্রাম্পের ন্যাটোভিত্তিক হুমকির পর এই দেশগুলোর অনড় অবস্থান আটলান্টিক
পাড়ের দেশগুলোর মধ্যে এক গভীর ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।





