মঙ্গলবার, ২৪শে মার্চ, ২০২৬, ১০ই চৈত্র, ১৪৩২

সারাদেশে তেলশূন্য হয়ে বন্ধ অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন

পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটির আমেজ শেষ হতে না হতেই সারাদেশে এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকট

দেখা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেলের

পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় ঈদের পরদিন থেকেই চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যানবাহনের চালক ও

সাধারণ মানুষ। তেলের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ জেলার ফিলিং স্টেশনগুলোতে দড়ি

টানিয়ে বা নোটিশ দিয়ে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের

জেলাগুলোতে এই সংকট এখন চরমে পৌঁছেছে। ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ডিপো

থেকে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে, যার ফলে তারা

গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের

সাথে পাম্প কর্মচারীদের বাগবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির খবরও পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র লক্ষ্য করা গেছে পঞ্চগড়-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে। এই রুটের ৯৩

কিলোমিটার এলাকার ৪৬টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৪৩টিই বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। কুড়িগ্রাম

জেলার ২০টি পাম্পের একটিতেও জ্বালানি তেল নেই, যার ফলে রবিবার থেকেই সবগুলো স্টেশন

বন্ধ রাখা হয়েছে। রাজশাহীতে ৪৪টি স্টেশনের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি বন্ধ। রাজশাহী জেলা

পেট্রল পাম্প মালিক সমিতি জানিয়েছে, ঈদের আগে মজুদ থাকা তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং

বাঘাবাড়ি ডিপো থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সরবরাহ

এতটাই কম যে, সাড়ে ১৩ হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন লরিতে মাত্র তিন হাজার লিটার

তেল পাওয়া যাচ্ছে। জনরোষ সামাল দিতে রাজশাহীর পাম্পগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের

দাবিও তুলেছেন মালিকরা।

দক্ষিণাঞ্চলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরিশাল নগরীসহ ১০টি উপজেলার মহাসড়ক

সংলগ্ন পাম্পগুলো দিনের অর্ধেকের বেশি সময় বন্ধ থাকছে। তেলের সংকটে বরিশাল ও খুলনার

পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টাও পাম্প চালু রাখতে পারছেন

না। খুলনার ৩৬টি পাম্পই বর্তমানে সংকটের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের ৩৮৩টি

পাম্পের অনেকগুলোতে অকটেন থাকলেও ডিজেল নেই, আবার কোথাও ডিজেল থাকলেও অকটেন মিলছে

না। তবে চট্টগ্রাম বিভাগের পাম্প মালিক সমিতির নেতারা আশা প্রকাশ করেছেন যে,

মঙ্গলবার ব্যাংক খোলার পর পে-অর্ডার জমা দেওয়া সম্ভব হলে বিকেলের মধ্যে পরিস্থিতির

কিছুটা উন্নতি হতে পারে। মূলত ঈদের লম্বা ছুটিতে ব্যাংক বন্ধ থাকায় এবং ডিপোগুলোর

সীমিত সরবরাহের কারণে এই সংকট প্রকট হয়েছে।

বগুড়া ও রংপুরের চিত্রও প্রায় একই। বগুড়ার ৭২টি পাম্পের মধ্যে ৩৫টি এবং রংপুরের

৪০টির মধ্যে ২০টিই বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ময়মনসিংহেও বেশিরভাগ পাম্প ঈদের দিন থেকেই

বন্ধ রাখা হয়েছে। এই তীব্র সংকটের সুযোগে কিছু অসাধু চক্র ছোট ছোট বাজারে

লিটারপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় তেল বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ গ্রাহকদের

অনেকের ধারণা, তেলের দাম বৃদ্ধির আশায় পাম্প মালিকরা সিন্ডিকেট করে মজুদ গড়ে

তুলেছেন। যদিও মালিকরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে সরবরাহ ঘাটতিকেই প্রধান কারণ হিসেবে

দায়ী করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কুড়িগ্রামসহ কয়েকটি জেলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ

থেকে পাম্পগুলোতে বিশেষ অভিযান চালানো হলেও কোথাও পর্যাপ্ত তেলের সন্ধান মেলেনি।

বর্তমান এই জ্বালানি বিপর্যয়ের ফলে সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চালকদের মধ্যে চরম

অসন্তোষ বিরাজ করছে। অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবা প্রদানকারী যানবাহনগুলোও সময়মতো

জ্বালানি না পেয়ে সংকটে পড়ছে। অনেক জায়গায় পাম্পে দীর্ঘ সারি এবং রেশনিং পদ্ধতিতে

তেল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ডিপো থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া

পর্যন্ত এই অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। সারাদেশে তেলশূন্য হয়ে

পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থবিরতা নেমে এসেছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায়, যা সাধারণ

মানুষের ঈদ-পরবর্তী কর্মস্থলে ফেরার পথকে আরও কণ্টকাকীর্ণ করে তুলেছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন