মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের কাছে ১৫ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে
যুক্তরাষ্ট্র। কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে অবগত দুই কর্মকর্তার সূত্রে এই তথ্য জানা
গেছে। যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয় সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন যে এই সংঘাত
থেকে বেরিয়ে আসতে কতটা মরিয়া, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। নিউইয়র্ক
টাইমসের প্রতিবেদনে এমনটি বলা হয়েছে।
পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো এই প্রস্তাবে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ে কতটুকু গুরুত্ব
পেয়েছে বা তারা একে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা চালানো ইসরায়েল এই প্রস্তাবে একমত
কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তবে এই শান্তি প্রস্তাব পাঠানোর মধ্য দিয়ে এটিই প্রতীয়মান হচ্ছে, চতুর্থ সপ্তাহে
গড়ানো এবং আরও কয়েকটি দেশকে জড়িয়ে ফেলা এই যুদ্ধ বন্ধে হোয়াইট হাউস এখন তাদের
তৎপরতা জোরালো করছে।
নিউইয়র্ক টাইমস এই পরিকল্পনা বা প্রস্তাবের কোনো অনুলিপি হাতে পায়নি। তবে
স্পর্শকাতর বিষয়ে আলোচনার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা এর কিছু
সাধারণ রূপরেখা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, এই প্রস্তাবে ইরানের ব্যালেস্টিক মিসাইল এবং
পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বিমান হামলায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মূলত
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, উৎপাদন স্থাপনা এবং পারমাণবিক
কর্মসূচিকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতারা শুরু থেকেই
অঙ্গীকার করে আসছেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেওয়া হবে
না।
তবে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানও ইসরায়েল এবং প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে ইরানের কাছে ৪৪০ কিলোগ্রাম উচ্চ
মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে।
এক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, প্রস্তাবিত এই শান্তি প্রস্তাবে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা
নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার ও
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পশ্চিমা জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলে
কার্যত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের
সরবরাহ যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি জ্বালানির দামও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
আপাতদৃষ্টিতে যুদ্ধ দ্রুত থামার কোনো লক্ষণ নেই; ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ধারণা করছেন
এই সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি
ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে কূটনৈতিক তৎপরতা চলার কথা স্বীকার করলেও বলেন,
‘কমান্ডার ইন চিফ ও পেন্টাগনের নির্ধারিত সামরিক লক্ষ্য অর্জনে ‘অপারেশন এপিক
ফিউরি’র হামলা অব্যাহত থাকবে।’
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ
আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত
হয়েছেন। একইসঙ্গে মিসর ও তুরস্কও ইরানকে ইতিবাচকভাবে আলোচনায় অংশ নিতে উৎসাহিত
করছে। ধারণা করা হয়, ফিল্ড মার্শাল মুনিরের সঙ্গে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর
(আইআরজিসি) নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, যা তাকে দুই পক্ষের মধ্যে দূতিয়ালি করার ক্ষেত্রে
একটি সুবিধাজনক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ইরানি ও একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফিল্ড
মার্শাল মুনির সম্প্রতি ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর
কমান্ডার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি ইরান ও
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে পাকিস্তানকে আলোচনার ভেন্যু হিসেবে প্রস্তাব
দিয়েছেন।
২০২৫ সালে ফিল্ড মার্শাল মুনির প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার সাক্ষাৎ করেন।
ট্রাম্প তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে তাকে নিজের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবেও অভিহিত
করেন। গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
এক পোস্টে লেখেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে চলমান সংলাপের প্রচেষ্টাকে তার দেশ
‘পূর্ণ সমর্থন’ জানায়।’
তিনি আরও লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্মত হলে, চলমান এই সংকটের একটি টেকসই
সমাধানের লক্ষ্যে অর্থবহ ও চূড়ান্ত আলোচনার আয়োজন করতে পাকিস্তান প্রস্তুত এবং একে
তারা সম্মানের বিষয় মনে করে।’
তবে মার্কিন এই প্রস্তাবের দ্রুত জবাব দেওয়া ইরানের জন্য কঠিন হতে পারে। সংশ্লিষ্ট
কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ
যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংকটে পড়েছেন এবং তারা আশঙ্কা করছেন, সশরীরে কোনো বৈঠকে মিলিত
হলে ইসরায়েল সেখানে বোমা হামলা চালাতে পারে।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইসরায়েল তেহরানে ইরানি নেতৃত্বের একটি কম্পাউন্ডে হামলা চালিয়ে
দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও আরও অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা
করে। ফলে বর্তমানে কূটনীতি, যুদ্ধ কিংবা শান্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত
ক্ষমতা আসলে কার হাতে রয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে আলোচনার জন্য হোয়াইট হাউসের এই ব্যাকুলতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ট্রাম্প বর্তমান
সরকারকে অন্তত আপাতত ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে রাজি; যদিও সেই সরকারকে অনেক বেশি দুর্বল
ও অনুগত হয়ে থাকতে হবে। এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চান কি
না, সে বিষয়ে ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো কোনো
স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।
কয়েক সপ্তাহ ধরেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল বলে আসছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা
মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বারবার দাবি করেছেন, ধারাবাহিক হামলা ইরানের কমান্ড
কাঠামো পঙ্গু করে দিয়েছে এবং তাদের পাল্টা হামলার ক্ষমতাও দুর্বল হয়েছে।
তাদের হিসাব অনুযায়ী, এ সংঘাত এখন শেষ হওয়ার দিকে এগোনো উচিত। কিন্তু বাস্তবে
উল্টোটাই ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। উত্তেজনা বৃদ্ধি দ্রুততর এবং আরও তীব্র হয়েছে আর
কমেছে যুদ্ধ শেষ করে বেরিয়ে আসার স্পষ্ট উপায়।





