রবিবার, ২৯শে মার্চ, ২০২৬, ১৫ই চৈত্র, ১৪৩২

ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নীতিমালার বিরুদ্ধে দেশটির বড়

শহরগুলোতে আবারও বিশাল বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ‘নো কিংস’ শিরোনামের এই বিক্ষোভ এবার

তৃতীয় দফায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে আগের বারগুলোতে কয়েক মিলিয়ন মানুষের সমাগম

ঘটেছিল।

বিক্ষোভের আয়োজকরা জানিয়েছেন, ইরানে যুদ্ধ, কেন্দ্রীয় অভিবাসন আইন কার্যকর এবং

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে তারা রাস্তায় নেমেছেন। আয়োজকদের

ভাষ্যমতে, ‘ট্রাম্প আমাদের ওপর একজন স্বৈরশাসকের মতো শাসন করতে চান। কিন্তু এটি

আমেরিকা, আর ক্ষমতার মালিক জনগণ- কোনো উচ্চাভিলাষী রাজা বা তার কোটিপতি বন্ধুদের

হাতে ক্ষমতা নয়।’

অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র এই বিক্ষোভকে ‘ট্রাম্প ডের্যাঞ্জমেন্ট থেরাপি

সেশন’ বলে উপহাস করেছেন। তিনি দাবি করেন, এই বিক্ষোভ নিয়ে কেবল সেই সব সংবাদদাতারাই

আগ্রহী যাদের এটি কভার করার জন্য পয়সা দেওয়া হয়।

গত শনিবার ওয়াশিংটন ডিসি, নিউ ইয়র্ক এবং লস অ্যাঞ্জেলেসসহ আমেরিকার প্রায় প্রতিটি

বড় শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে বিক্ষোভকারীরা লিংকন মেমোরিয়ালের

সিঁড়িতে অবস্থান নেন এবং ন্যাশনাল মল এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। তারা ট্রাম্প, ভাইস

প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাদের কুশপুতুল প্রদর্শন

করে তাদের অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

এবারের বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল মিনেসোটা। সেখানে গত জানুয়ারিতে

কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে রেনি নিকোল গুড এবং অ্যালেক্স প্রেত্তি নামে

দুই মার্কিন নাগরিক নিহতের ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। সেন্ট পলে স্টেট

ক্যাপিটল ভবনের সামনে আয়োজিত সমাবেশে ডেমোক্র্যাট দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।

কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিন সেখানে তার অভিবাসনবিরোধী আইন নিয়ে লেখা

গান ‘স্ট্রিটস অফ মিনিয়াপলিস’ পরিবেশন করেন।

নিউ ইয়র্ক সিটির টাইমস স্কয়ারেও হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন। জনসমাগমের কারণে পুলিশ

ম্যানহাটনের ব্যস্ত রাস্তাগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। গত অক্টোবরের বিক্ষোভে

শহরটির পাঁচটি বরো মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।

সহিংসতা ও গ্রেপ্তার

বিক্ষোভ চলাকালীন লস অ্যাঞ্জেলেসে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। ডিপার্টমেন্ট অফ

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) জানিয়েছে, প্রায় এক হাজার দাঙ্গাকারী রয়্যাল

ফেডারেল বিল্ডিং ঘেরাও করে কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে সিমেন্টের ব্লক ছুড়ে মারে। এতে

দুই কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ

জানিয়েছে, ফেডারেল কারাগারের কাছে ছত্রভঙ্গ হওয়ার নির্দেশ না মানায় আরও বেশ

কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং জনতাকে সরাতে ‘নন-লেথাল’ বা অ-মরণঘাতী ব্যবস্থা

গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া ডালাসে পাল্টা-বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনায় বেশ

কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও বিতর্ক

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে

কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন অংশ ভেঙে দেওয়া এবং অঙ্গরাজ্যের গভর্নরদের আপত্তি

সত্ত্বেও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করার মতো পদক্ষেপ নিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা

ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছেন। এছাড়া তিনি তার রাজনৈতিক বিরোধীদের বিচার করার জন্য আইন

প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছেন।

ট্রাম্প অবশ্য নিজেকে রাজা বা স্বৈরশাসক হিসেবে মানতে নারাজ। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে রাজা বলছে, কিন্তু আমি রাজা নই।’ তার মতে, একটি

সংকটাপন্ন রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করতেই তিনি এই পদক্ষেপগুলো নিচ্ছেন। তবে সমালোচকদের

দাবি, তার এসব পদক্ষেপ অসাংবিধানিক এবং আমেরিকান গণতন্ত্রের জন্য চরম হুমকি।

বিশ্বজুড়ে সংহতি

আমেরিকার বড় বড় শহর ছাড়াও শেলবিভিল এবং হাউলের মতো ছোট শহরগুলোতেও মানুষ রাস্তায়

নেমে যুদ্ধ ও অভিবাসন নীতির প্রতিবাদ জানিয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, প্যারিস,

লন্ডন এবং লিসবনের মতো আন্তর্জাতিক শহরগুলোতেও প্রবাসী মার্কিনিরা জড়ো হয়ে

ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দিয়ে তার অভিশংসন দাবি করেছেন।

গত অক্টোবরে ‘নো কিংস’ র‍্যালিতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল। এবারও

শিকাগো, বোস্টন, ন্যাশভিল এবং হিউস্টনের মতো শহরগুলোতে বিক্ষোভ দানা বাঁধছে। উদ্ভূত

পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ কয়েকটি রাজ্যে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়েছে।

গণহত্যাকারী ইসরায়েলের ফাঁদে পা দিয়ে ইরানে আগ্রাসন চালাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসন ব্যবস্থার পতন

ঘটাতে গিয়ে নিজ দেশে নজিরবিহীন বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন যুদ্ধবাজ এই নেতা। এখন তার

নিজের চেয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। ক্রমেই বাড়ছে বিক্ষোভ, হামলা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা

রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যালয়, প্রশাসনিক দপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায়। এতে এখন

পর্যন্ত দুই বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানায়, ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের

রয়্যাল ফেডারেল বিল্ডিং হাজারো বিক্ষোভকারী ঘিরে ফেলেছেন। তারা ফেডারেল আইন

প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের ওপরও হামলা করছেন। এ অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা

হয়েছে।

সংস্থাটি জানায়, প্রায় ১ হাজার বিক্ষোভকারী ভবনটি ঘিরে ফেলে। বিবৃতি অনুযায়ী,

ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হামলায় দুই কর্মকর্তা সিমেন্টের ব্লকের আঘাতে আহত

হয়েছেন এবং তারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বের বিরোধিতায় যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ৩ হাজার

৩০০টিরও বেশি ইভেন্টে আনুমানিক ৮০ লাখ মানুষ সমবেত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ ঘটনা ঘটল।

পোস্টটি শেয়ার করুন