সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দুবাইয়ের জলসীমায় এক ভয়াবহ
ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের
সশস্ত্র বাহিনী দুবাইয়ের উপকূলে অবস্থানরত কুয়েতের একটি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজকে
লক্ষ্য করে এই ড্রোন হামলা চালায়। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান ব্যাপক সামরিক
উত্তেজনার মাঝে এই ঘটনাটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে
নতুন করে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
হামলার শিকার কুয়েতি জাহাজটি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল বহন করছিল বলে সংশ্লিষ্ট
সূত্র নিশ্চিত করেছে। যদিও প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এই হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো
প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে ড্রোন বিস্ফোরণের ফলে জাহাজটির কাঠামো
উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে করে পারস্য উপসাগরের জলসীমায় বড় ধরনের তেল
ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য এক মারাত্মক
বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কুয়েত মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ
মিত্ররাষ্ট্র হওয়ায় এই হামলাকে সরাসরি ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে
দেখা হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলাটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের
সাম্প্রতিক এক কঠোর হুঁশিয়ারির পাল্টা প্রতিক্রিয়া। গত রোববার ট্রাম্প ঘোষণা
করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে ইরানের তেল সম্পদ ও জ্বালানি রপ্তানির প্রধান
কেন্দ্র এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘খার্গ দ্বীপ’ দখল করে নেবে।
ট্রাম্পের এই সরাসরি হুমকির মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই কুয়েতের জাহাজে এই হামলা
চালিয়ে ইরান এটিই প্রমাণ করতে চাইছে যে, তারাও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদেশগুলোর ওপর
আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে।
উল্লেখ্য যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই বর্তমান সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল গত ফেব্রুয়ারি
মাসের শেষভাগে। ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন ও
তেহরানের মধ্যে দীর্ঘ ২১ দিন ধরে নিবিড় সংলাপ চললেও শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা চুক্তি
ছাড়াই তা শেষ হয়। সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পরদিন, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে
যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইসরায়েল ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামে ইরানে
বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই অভিযানের প্রথম দিনেই এক ভয়াবহ বিমান হামলায়
ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ সামরিক ও
প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নিহত হন।
শীর্ষ নেতৃত্ব হারানোর পর থেকে ইরানও সমানতালে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েল ছাড়াও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬টি দেশ—সৌদি আরব,
কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি
এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
অব্যাহত রেখেছে তেহরান। দুবাই উপকূলে কুয়েতি জাহাজে হামলার এই সর্বশেষ ঘটনাটি সেই
ধারাবাহিক সংঘাতেরই একটি অংশ। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও সমুদ্রপথ এখন এক
অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিকে এক চরম
অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।





