শনিবার, ৪ঠা এপ্রিল, ২০২৬, ২১শে চৈত্র, ১৪৩২

গারো পাহাড়ে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বের সমাধান কী?

বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ গারো পাহাড়ে অবাধে ঘুরে বেড়ায় বন্যহাতির দল। একইসঙ্গে এই পাহাড়ের ঢালে বসবাস করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষ। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে হাতি ও মানুষের পরিস্থিতি একসঙ্গে চলে আসছে। তবে অতীতে যেমন হাতির আক্রমণে মানুষ নিহত হচ্ছিল, বর্তমানে হাতি হত্যা ও সংঘর্ষের ঘটনাগুলো নিয়মিত হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় সীমান্তের কাছাকাছি শেরপুরের নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, নেত্রকোনা ও জামালপুরের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এই দ্বন্দ্বের ঘটনা ঘটে চলেছে। তবে এর কোন স্থায়ী সমাধান এখনও বের হয়নি।সূত্র জানায়, ১৯৯৫ সালে ভারতের মেঘালয় থেকে প্রায় ২৫-৩০টির একটি হাতির পাল গারো পাহাড়ে প্রবেশ করে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও বিজিবির বাধায় তারা আর ফিরতে পারেনি। এরপর থেকে অন্যান্য বছরেও অর্ধশতাধিক হাতির সন্তান জন্ম নিয়েছে, ফলে বর্তমানে এই অঞ্চলে হাতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই শতাধিকের বেশি।

প্রথমে যেখানে এই পাহাড়গুলোতে পর্যাপ্ত খাদ্য ছিল, এখন সেখানে খাদ্য সংকট দেখা दीছে। পাহাড়ে মানুষের বসবাস ও জমির দখল বাড়ার কারণে হাতির খাদ্য সংকটে পড়ছে। ফলাফল হিসেবে তারা বেশিরভাগ সময় খাদ্যের সন্ধানে মানুষের অঞ্চলে প্রবেশ করে, যেখানে তারা ফসল নষ্ট করে ও বসতবাড়িতে ঢুকে পড়ে। কেউ কেউ হাতির পাল দ্বারা পিষ্ট হয়ে মৃত্যুও ঘটছে। এর পাশাপাশি, ফসল রক্ষা করতে বিদ্যুতের তারে হাতি ঝুলে মারা যাচ্ছে।

১৯৯৬ সালে প্রথম এই সমস্যাগুলো শেরপুরের ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে গুরুতর আকারে দেখা দেয়। এই এলাকায় গারো, হাজং, কোচ, বানাই বর্মন, হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের লক্ষাধিক লোক বসবাস করেন। তারা প্রায় সবাই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এ এলাকাগুলোর হাতির আক্রমণ ধীরে ধীরে আরও বেড়ে চলেছে, যা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এখানকার বাসিন্দারা।

অভিযোগকারীরা জানাচ্ছেন, দেড় শতাধিক হাতির পাল দিনের বেলায় গভীর অরণ্যে থাকে; সন্ধ্যার পর খাদ্যের খোঁজে তারা লোকালয়ে ও কৃষি জমিতে আসতে শুরু করে। কৃষকরা ফসল রক্ষা করতে রাত জেগে পাহারা দেয়, কিন্তু সফলতা মিলছে না। হাতির তাণ্ডবের প্রতিরোধে তারা ঢাকঢোল পিটিয়ে, পটকা ফুটিয়ে ও মশাল জ্বালিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবুও পরিস্থিতি ঠিক হচ্ছে না। পতনের সাথে সাথে ঘরবাড়ি, ফসল সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পোড়াগাঁও ইউনিয়নের বুরুঙ্গা কালাপানি গ্রামের বাসিন্দা উকিল উদ্দিন, এরশাদ আলম ও বাদশা মিয়া জানান, ক্ষতিপূরণের জন্য তারা নানা ঝামেলা পোহাচ্ছেন। অনেক জমি শত্রু সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ডে আছে, ক্ষতিগ্রস্ত জমির রেকর্ড না থাকলে ক্ষতিপূরণও পাওয়া যায় না।

শেরপুর জেলা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ বিভাগ জানিয়েছেন, ২০১৪ সাল থেকে এসব অঞ্চলে হাতির আক্রমণে গত আট বছরে ৪২ জন মানুষ নিহত ও কয়েকশ মানুষ আহত হয়েছেন। এই সময়ে তিনটি বন্যহাতির মৃত্যু হয়েছে।

বন বিভাগ জানাচ্ছে, হাতি মানুষের দ্বন্দ্ব কমাতে তারা নিয়মিত কাজ করছে। এ জন্য তারা ২৫টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন করেছে। হাতির আক্রমণে কেউ নিহত হলে ৩ লাখ, আহত হলে ১ লাখ ও ফসল নষ্ট হলে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।

বন বিভাগের মধুটিলা রেঞ্জ কর্মকর্তা দেওয়ান আলী বলেন, ‘হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বের কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি। এর জন্য বাইর থেকে খাবার আনানোর পাশাপাশি, পাহাড়ে কলাগাছ ও বিভিন্ন গাছ রোপণ করা হচ্ছে, যাতে খাদ্য সংকট কম হয়।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতি মূলত তৃণভোজী এবং দিনে প্রায় ১৫০ কেজি ঘাস ও ১৯০ লিটার পানি পান করে। এ জন্য তাদের বেশি জায়গা ও খাদ্য পাওয়ার জন্য ঘুরে বেড়াতে হয়। যদি এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসলে এই ধীরপ্রজননকারী প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, ‘মানুষের আবাসন দখল ও বন উজাড়ের কারণে হাতি-মানুষ সংঘর্ষ বাড়ছে। হাতি রক্ষা করতে হলে প্রথমে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুরক্ষিত করতে হবে। যেখানে যেখানে হাতি চলাচল করে, সেখানে মানুষের বসতি কমিয়ে মসলা জাতীয় ফসলের চাষ করতে হবে।’

পোস্টটি শেয়ার করুন