সোমবার, ৬ই এপ্রিল, ২০২৬, ২৩শে চৈত্র, ১৪৩২

তাইওয়ানে আতঙ্ক ও পরিনতির জন্য নাগরিকদের পরিকল্পনা জোরদার

চীনের সামরিক চাপ ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তাইওয়ানের মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে গেছে। দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি অনেক নাগরিক ব্যক্তিগত পণ্য ও সম্পদ রক্ষা করতে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। অনেকেই এখন থেকে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে বিদেশে সম্পদ স্থানান্তর করছেন এবং দ্বিতীয় পাসপোর্টের জন্য আবেদন করছেন, যাতে পরিস্থিতি খারাপ হলে তারা নিরাপদে থাকতে পারেন।

নেলসন ইয়ে, ৫১ বছর বয়সি একজন তাইওয়ানিজ, তিন বছর আগে সিঙ্গাপুরে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে নিজের ও পরিবারের অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেন। এরপর তিনি তুরস্কের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন এবং নিজের ও স্ত্রীর জন্য দ্বিতীয় পাসপোর্ট পান। তার মতে, যদি চীনা আঘাত হলে, এই কার্যক্রম তাদের জন্য বড় সহায়ক হতে পারে। তিনি বলেন, ‘এমন হুমকি থাকলেও কম নয়, আর যদি ঘটে তাহলে বিপুল ক্ষতি হতে পারে। তাই বিকল্প পরিকল্পনা থাকা জরুরি।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে বিশ্ব পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।

তাইওয়ানের দীর্ঘদিন যাবত চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা থাকছে। বেইজিং মনে করে, তাইওয়ান তাদের অংশ আর সেটি বারবার দেখানোর জন্য সামরিক মহড়া ও অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বহু মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা, অস্ত্র পরিচালনার ট্রেনিং নিচ্ছেন এবং বিদেশে অবস্থান গড়ে তোলার উপায় খুঁজছেন।

‘আজ হংকং, কাল তাইওয়ান’—চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণের পর থেকেই এই শ্লোগানটি তাইওয়ানিজদের মনে গেঁথে গেছে। ২০১৯ সালে হংকংয়ের গণতন্ত্রমুখী আন্দোলনের সময় এই কথাটি খুবই জনপ্রিয় হয়। এরপর ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর, অনেকের মধ্যে এই আশঙ্কা আরো প্রবল হয়ে উঠেছে যে কোনওসময় এদেশগুলোও একইভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেন নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে এগিয়ে আসছে। ব্যাংককের এক রিয়েল এস্টেট এজেন্ট জানিয়েছেন, তাদের সংস্পর্শে আসা প্রায় ৭০ শতাংশই ধারনা করছেন, চীনা অস্থিরতা বা সংঘাতের সময় তারা যেন নিরাপদ স্থানে পাড়ি দিতে পারেন। তাইওয়ানের নাগরিকেরা কম্বোডিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো দেশে সম্পত্তি কিনছেন বা নতুন ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করছেন, যাতে যুদ্ধের সময় আকাশপথ বন্ধ হলেও নৌপথে পালানোর ব্যবস্থা থাকে।

অর্থাৎ, যুদ্ধের সময় যেখানে লড়াই বা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, আবার অনেকেরই নিরপত্তায় সরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। এক জরিপের অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যেERT, শুরুর সম্ভাবনা থাকলে, তাইওয়ানের ২০ শতাংশ নাগরিক প্রতিরোধ বা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পক্ষে। অন্যদিকে, ১১ শতাংশ বলেছেন, তারা সরাসরি দেশ থেকে পালিয় যাবেন। ১৭ শতাংশ মনে করেন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে থাকবেন, আর ৩৭ শতাংশ ব্যক্তিগত পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে চলবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ানের মানুষের এই মানসিকতা চীনা ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি তারা বুঝতে পারেন, জনগণের মানসিকতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয় বা তাদের লড়াইয়ের ইচ্ছা কম, তবে চীন আরও সাহসী হয়ে আক্রমণে ঝুঁকি নেবে।

এদিকে, গত পাঁচ বছরে ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্টদের মতে, সেন্ট লুসিয়া, ভানুয়াতু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। আগে যারা মূলত যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার গ্রিন কার্ডের জন্য ভাবনা ছিল, এখন তারা ঝুঁকি কমানোর জন্য এবং তাদের সম্পদ বৈচিত্র্য আনার জন্য এই দেশগুলোকে পছন্দ করছেন।

বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সম্ভব বৈঠক দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে, অনেক তাইওয়ানিজ নাগরিকের জন্য নিজ দেশ এক ধরনের ‘অস্তিত্বের প্রশ্ন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার দেখছেন তারা।

পোস্টটি শেয়ার করুন