সোমবার, ৬ই এপ্রিল, ২০২৬, ২৩শে চৈত্র, ১৪৩২

ইরান সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে: নতুন শঙ্কা

ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চিতভাবে ধ্বংস বা ভূপাতিত এয়ারক্রাফটের সংখ্যা অন্তত ১৬টির বেশি। সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বা নিখোঁজ বিমানসহ এই সংখ্যা আরও বাড়ছে, সম্ভবত মোট ২০টির কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে।

৩ এপ্রিল প্রকাশিত রায়টার্স, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান এবং বিজনেস ইনসাইডার এর প্রতিবেদনগুলো জানায়, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের ভেতরে ভূপাতিত হওয়া প্রথমবারের মতো নিশ্চিতকরণ করা হয়েছে এক এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ধ্বংসের ঘটনা। মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্রে বলা হয়েছে, দুই ক্রুর একজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অপরজন নিখোঁজ রয়েছেন।

এছাড়াও, একই দিন এক এ-১০ থান্ডারবোল্ট-২ আক্রমণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, এই ঘটনায় উদ্ধার কাজ চালানোর সময় মার্কিন একটি হেলিকপ্টার হামলার মুখে পড়ে, যা সংঘাতের জটিলতা বাড়িয়ে তোলে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে ড্রোন যুদ্ধবিমান খাতে। এনডিটিভি ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা ভিত্তিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, নজরদারির জন্য ব্যবহৃত এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের অন্তত ১০টি ভূপাতিত হয়েছে। কিছু বিশ্লেষণে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোনগুলো তুলনামূলক ধীরগতির হওয়ায় এবং নির্দিষ্ট ফ্লাইট প্যাটার্নে চলায় এগুলো সহজেই শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হয়ে উঠছে। স্থলভিত্তিক সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (এসএএম), মোবাইল এয়ার ডিফেন্স ইউনিট এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তির সমন্বয়ে ইরান এসব ড্রোন এবং ক্ষুদে বিমানগুলোকে সফলভাবে লক্ষ্য করে ধ্বংস করছে।

শিল্প পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এই ক্ষতির অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। একটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের মূল্য আনুমানিক ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, এক এফ-১৫ যুদ্ধবিমান প্রায় ৮০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ। এইসব সহকারী বিমানও অত্যন্ত কৌশলগত সম্পদ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংঘাতের প্রথম দিকেই এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা বর্তমানে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই ক্ষতিকারক প্রভাব কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ও গোয়েন্দা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়া, যুদ্ধের জন্য আকাশে আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষমতাও সংকটজনক হয়ে উঠছে।

সার্বিকভাবে, ইরানের এই চলমান সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকলেও, শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়ে মার্কিন সেনাবাহিনী এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার চেষ্টা করছে।

ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার করে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। ইরানের জয়েন্ট এয়ার ডিফেন্স ঘাঁটির উচ্চপদস্থ জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলীরেজা ইলহামি বলেছেন, তাদের বাহিনী নতুন পদ্ধতি ও উন্নত সরঞ্জাম দিয়ে মার্কিন বিমান শিকার করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, একই দিনে দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। এরমধ্যে একটি ইরানের আকাশসীমায় গুলি করে নামানো হয়, যার একজন ক্রু সদস্য এখনও নিখোঁজ। অন্য বিমানটি বা আঘাতে বিধ্বস্ত হয়।

অন্যদিকে, চলমান এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানক্ষেত্রে আরও ক্ষতি হয়েছে। সর্বশেষ দুইটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর মোট ধ্বংসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত সাতটিতে। এর মধ্যে একটি এফ-৩৫ ও একটি এ-১০ বৃহস্পতিবার পৃথক ঘটনা।

এছাড়াও, আগে অন্যান্য পর্যায়ে আরও পাঁচটি বিমান হারিয়েছে মার্কিন বাহিনী। মারসিরি ২ মার্চ কুয়েতের আকাশে ফ্রেন্ডলি ফায়ারে তিনটি এফ-১৫ ভূপাতিত হয়। সৌভাগ্যবশত, ছয়জন ক্রু সদস্য নিরাপদে বেরিয়ে আসেন। ১২ মার্চ, ইরাকের একটি কেসি-১৩৫ ট্যাঙ্কার প্লেন দুর্ঘটনায় ছয়জন মার্কিন বিমানকর্মীর মৃত্যু হয়। মার্কিন সেনাবাহিনী জানায়, এটি শত্রুর আক্রমণ নয়, বরং অপারেশন চলাকালীন অন্য বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

এছাড়াও, ২৭ মার্চ সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসে ইরানের হামলায় একটি ই-৩ সেন্ট্রি তৎক্ষণাৎ ধ্বংস হয়। এতে কমপক্ষে ১০ মার্কিন সেনা আহত হন এবং একই সঙ্গে একটি ট্যাংকার বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইরানের সামরিক উচ্চ স্থানীয় কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, আধুনিক কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা মার্কিন বিমানে সফলভাবে হামলা চালাচ্ছে। এতে শত্রুপক্ষের বিভ্রান্তি বাড়ছে এবং আকাশসীমার উপর নতুন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন