রবিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২৬, ২২শে চৈত্র, ১৪৩২

তাইওয়ানে চীনের সম্ভাব্য আক্রমণের ভয়ে মানুষের উদ্বেগ ও পালানোর সিদ্ধান্ত

চীনের সম্ভাব্য আক্রমণের আশঙ্কায় এবং বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপে তাইওয়ানের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। তাইওয়ানে চীনের আগ্রাসন বন্ধে সরকার বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও, অনেক নাগরিক ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে বিকল্প উপায় খুঁজছেন।

সম্পদ সরানোর পরিকল্পনা ও দ্বিতীয় পাসপোর্টের চাহিদা, এ ধরনের উদ্যোগ বর্তমানে বেশ বাড়ছে। তাইপের ৫১ বছর বয়সী নেলসন ইয়ে তিন বছর আগে সিঙ্গাপুরে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে তার কিছু সম্পদ বিদেশে স্থানান্তর করেছেন। পাশাপাশি তিনি তুরস্কের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করে নিজের ও স্ত্রীর জন্য দ্বিতীয় পাসপোর্ট পান। তিনি বলেন, ‘যদি কখনো হামলা হয়, তবে আমি আমার বিদেশে রাখা অর্থ ব্যবহার করতে পারব এবং অন্য দেশে নিরাপদে চলে যেতে পারব। এটি বিকল্প পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’ সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার বিশ্ব পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তাইওয়ান এখন চীনের নিঃশর্ত একতরফা আয়ত্তের দাবি নিয়ে বারবার উত্তপ্ত হচ্ছে। বেইজিং মনে করে, তাইওয়ান তাদের অঙ্গ, আর তাই এই দ্বীপটির ওপর নিয়মিত সামরিক মহড়া ও অবরোধের অনুশীলন চালাচ্ছে। এর ফলে, অনেক তাইওয়ানবাসী বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, যেমন প্রাথমিক চিকিৎসা ও অস্ত্র চালানো। অনেকEffectপই বিদেশে পালানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তারা।

‘আজ হংকং, কাল তাইওয়ান’—এই slogans যে সময়ে হংকংয়ে চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর সাধারণের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল, এখন তাইওয়ানেও এই ধারণা প্রান্তরে এসে পৌঁছেছে। ২০১৯ সালে হংকংয়ের গণতন্ত্রকামী আন্দোলনের সময় এত বেশি শোনা যাচ্ছিল যে, ‘আজ হংকং, কাল তাইওয়ান’ কথাটি এখন অনেকের ভাবনা। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ চালানোর পর এই ধরনের উদ্বেগ আরও বাড়ে।

তাইওয়ানীদের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে আগ্রহ বাড়ছে। ব্যাংককের এক রিয়েল এস্টেট এজেন্ট জানিয়েছেন, তাদের প্রায় ৭০ শতাংশ সংযোগকারীই চিন্তা করছেন মাতৃভূমি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার জন্য। তারা মালয়েশিয়া বা কম্বোডিয়ার মতো দেশে সম্পত্তি কিনছেন বা সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, যাতে যুদ্ধ লাগলেও নৌপথের মাধ্যমে পালানো সম্ভব হয়।

একজন বিশ্লেষক বলেন, ভবিষ্যতে যদি যুদ্ধের সূচনা হয়, তাহলে তাইওয়ানের প্রায় ২০ শতাংশ নাগরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার বা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পক্ষে থাকবেন। অন্যদিকে, ১১ শতাংশ সরাসরি দেশ ছেড়ে পালানোর কথা বলছেন। ১৭ শতাংশ সরকারে সমর্থন দিয়ে থাকেন, আর ৩৭ শতাংশ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে চলার কথা জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ানের মানুষের মধ্যে লড়াই করার মনোভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি চীন ও মার্কিন নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। যদি চীন বুঝতে পারে যে তাদের নাগরিকরা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত নয়, তাহলে আক্রমণের সাহস আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, ইমিগ্রেশনের বিষয়ে কনসালট্যান্টরা জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে সেন্ট লুসিয়া, ভানুয়াতু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে বিনিয়োগ করে নাগরিকত্ব নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। আগে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার গ্রিন কার্ডে বেশি আগ্রহ ছিল, এখন ঝুঁকি কমাতে ও সম্পদের বৈচিত্র্য আনতে এই দেশগুলোতেই বেশি বিনিয়োগ হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের পরের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান ও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সম্ভাব্য বৈঠক ভবিষ্যতের তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এভাবে, বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে অনেক তাইওয়ান নাগরিকের কাছে তাদের নিজস্ব জন্মভূমি এখন এক ধরনের অনিশ্চিত গন্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন