বুধবার, ৮ই এপ্রিল, ২০২৬, ২৫শে চৈত্র, ১৪৩২

ইউরোপে বিপজ্জনক পথে যাত্রা, সাগরেই ডুবছে স্বপ্ন

স্বপ্নের ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় বিপজ্জনকভাবে অবৈধ পথে সাগরপথে যাত্রা করে বাংলাদেশিরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়ার ভয়াবহ ঘটনা যেন থামছেই না, যেখানে এখনো অনেকের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দেশী দালালদের প্রলোভনে পড়ে তারা ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় করে লিবিয়া থেকে গ্রিস বা ইতালি ঘেঁষা দেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছেন, কিন্তু বন্দরে পৌঁছানোর আগেই সাগরে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাণ। সর্বশেষ লিবিয়ার উপকূলে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে, যেখানে অন্তত ৭০ জন অভিবাসী নিখোঁজ রয়েছে। উদ্ধারকর্মরা বলছে, এই নৌকায় কমপক্ষে ১০০ জন যাত্রী ছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোরের মধ্যে লিবিয়ার তাজৌরা বন্দর থেকে রওনা দেয় ছোট এই নৌকাটি। পথে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে নৌকায় পানি ঢোকায় দ্রুত সেটি ডুবে যায়। জার্মান ভিত্তিক উদ্ধার সংস্থা সি ওয়াচের একটি বিমান ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা পাওয়ার পর জানায়, উল্টে যাওয়া নৌকায় অনেক যাত্রী গাঢ় আঁকড়ে ধরে ছিল এবং কিছু মরদেহও ভেসে আসছিল। পরে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের কাছাকাছি জাহাজ দুটি জীবিতদের উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত ৩২ জনের মধ্যে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিসরের নাগরিক রয়েছেন, এছাড়া মরদেহের সঙ্গেও দেশে ফেরত আনা হয়। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানাচ্ছে, এই নৌকাটি সাধারণত অনুপযুক্ত ছিল এবং ধারণা করা হচ্ছে এতে অন্তত ১২০ জন যাত্রী ছিল। বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিবাসী ট্র্যাজেডির একটি বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে পর্যন্ত, আইওএমের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৫০ জন অভিবাসী নিখোঁজ অথবা প্রাণ হারিয়েছে। এ বছরই অন্তত ৭২৫ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজের খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপান্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কারণ সেখানে বৈধ প্রবেশের কোনো পথ নেই বলে জানা গেছে। এই পরিস্থিতি প্রতিদিনই আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যে, গত শুক্রবার গ্রিসের উপকূলে নৌকা ডুবে ১৮ থেকে ২০ বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে সুনামগঞ্জের ১২ যুবক। নিহত ব্যক্তিদের স্বজনরা জানাচ্ছেন, দালালরা বড় জাহাজের বদলে ঝুঁকিপূর্ণ ছোট প্লাস্টিকের নৌকা দিয়ে তাদের পাঠানো হয়, যেখানে গন্তব্যের পথে বিভিন্ন ভুল রাস্তায় পালানোর কারণে বেশ কয়েক দিন সময় অতিবাহিত হয়। খাবার ও পানি সংকটের কারণে অনেকেই মারা যান। দেশের বিভিন্ন অংশে এই রকম মৃত্যুর ঘটনা যেন দিন দিন বাড়ছেই। সরকারি তথ্য ও সংস্থাগুলোর নিদারুণ রিপোর্ট বলছে, এই বছরই এই পথে যাত্রার সময় অন্তত ৫০০ বাংলাদেশি মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। তবে, বাস্তবে এর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। দালাল ও মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ উঠলেও, এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ পথ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অপরাধের অর্থনীতি মোটা অঙ্কের টাকা এসে পড়ে, যা এর নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তোলে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত শুক্রবারের নৌকাডুবির ঘটনায় ১৮-২০ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং ২১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভূমধ্যসাগরে বড় ট্র্যাজেডিতে ২৩ জনের মরদেহ পাওয়া যায়। এ ঘটনাগুলো এও প্রমাণ করে, অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার পথে বাংলাদেশিরা আশঙ্কাজনক ঝুঁকি নিয়ে জীবন হারাচ্ছে। সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার পরিবারের লোকজন বলেন, দালালরা কোটি টাকা চুক্তি করে বড় জাহাজ পাঠানোর কথা বলে, কিন্তু পরে ছোট নৌকা দিয়ে সাগরে ছেড়ে দেয়। ভুল রাস্তায় ঘোরাঘুরি, খাবার ও পানির অভাবে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর থেকে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মামলা হয়েছে, যেখানে দালাল ও মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে, এই পথে যাওয়া বন্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর আইন ও প্রশাসনিক তৎপরতা না থাকলে মৃত্যুর মিছিল থামবে না। বাংলাদেশে অনেক মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ স্বপ্নের পেছনে জীবন দিচ্ছে, আর দালাল চক্রগুলো লাভবান হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রিপোর্টের মধ্যে উঠে এসেছে, এই রুট দিয়ে প্রতি বছরই শত শত বাংলাদেশি প্রাণ হারাচ্ছেন। সব মিলিয়ে, মানবপাচার ও অবৈধ যাত্রার এই নোংরা চক্রের বিরুদ্ধে আন্তরিক ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী। প্রশাসন ও সমাজের সবাইকে সচেতনতা বৃদ্ধি করে এই জঞ্জাল বন্ধ করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে আর কেউ জীবন হারানোর শঙ্কায় না থাকেন।

পোস্টটি শেয়ার করুন