বুধবার, ৮ই এপ্রিল, ২০২৬, ২৫শে চৈত্র, ১৪৩২

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কর্মহীনতার সৃষ্টি

আধুনিক যুগে প্রযুক্তির ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়ন কাজ দ্রুত এবং আরও দক্ষতার সাথে হচ্ছে, ফলে বাংলাদেশ বিভিন্ন প্রযুক্তিতে অগ্রসর হচ্ছে। অফিস-আদালতসহ সবক্ষেত্রে প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়েছে এবং মাঠের কাজগুলোতেও প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। এই প্রযুক্তির সুবিধা সাধারাণ মানুষের জন্য বেশিই, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে সাধারণ মাঝারি ও উচ্চ আয়ের মানুষ সবাই এতে উপকৃত হচ্ছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি একটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে—স্থানীয় শ্রমবাজারে কর্মসংস্থান হ্রাস। যখন প্রযুক্তি আসে তখন কাজের কিছু অংশ স্বয়ংক্রিয় মেশিনের দ্বারা সম্পন্ন হতে শুরু করে, যা মানুষের প্রয়োজন কমে যায় এবং ফলে অনেক শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন। অনেকেই সময়ের সঙ্গে তাল মিলাতে না পেরে চাকরি হারাচ্ছেন, আবার কিছু মানুষ পরিস্থিতির মোকাবিলা করে নতুন কাজের দিকে ঝুঁকছেন। তবে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা কোনো ধরনের দক্ষতা অর্জন করতে না পারায় পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়ছেন।

আওলাদ হোসেন বলেন, আগে রাস্তার কাজ, বেড়িবাঁধ নির্মাণ, মাটিকাটা ইত্যাদি শ্রমশক্তি দ্বারা পরিচালিত হতো। এখন এক্সকোভেটর মেশিনের আসার ফলে এই কাজগুলো দ্রুত ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হচ্ছে, ফলে শ্রমিকেরা বেকার হয়ে পড়ছেন। একই কথা বলেন আক্তার হোসেন, যার ভাষ্য অনুযায়ী, ধান কাটার মৌসুমে স্থানীয় মানুষ স্বেচ্ছায় কাজ করতেন, কিন্তু এখন উন্নত প্রযুক্তি এবং মেশিন ব্যবহারের কারণে ঐ মৌসুমে শ্রমিকের উপার্জন কমে গেছে।

বিএনপি নেতা ও শিল্পপতি কাজী মনিরুজ্জামান বলছেন, ভবিষ্যতে যত বেশি প্রযুক্তি আসবে, তত বেশি করে মানুষের কর্মসংস্থান কমবে। কয়েক বছর পরে অনেক কাজই সম্পন্ন হবে মেশিনের মাধ্যমে, ফলে শ্রমিকরা ঝড়ে পড়বে। যারা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে সক্ষম হবেন, তারা সম্ভবত টিকে থাকবেন। অফিসের দিকেও এই মনোভাব দেখা যায়, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকবল কমিয়ে আনা হচ্ছে। একটি কম্পিউটারাইজড প্রোগ্রাম একাধিক মানুষের কাজ করে দিতে সক্ষম, যা সহজে কর্মসংস্থান কমিয়ে দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা ইকোনমিস্ট ইউনিটের (ইআইইউ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১০০ শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৪৭ জনই বেকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ, আর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর হিসেব অনুযায়ী, বেকার সংখ্যা মোট ৩ কোটি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই প্রবণতা রোধ করতে না পারলে, মানুষ পিছিয়ে পড়বে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয় বলছেন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ছাড়া সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। বিভিন্ন ভোকেশনাল কোর্স চালু, শ্রমিক সংগঠন গঠন, লিঙ্গভেদে সমান সুযোগ সৃষ্টি, শিশুশ্রম বন্ধ, দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার, কাজের পরিবর্তে সামঞ্জস্যের ব্যবস্থা এবং দরকার হলে সরকারের আর্থিক সহায়তা—এসব উদ্যোগ জরুরি।

রূপগঞ্জের বেকার কল্যাণ সংস্থার সভাপতি নজরুল ইসলাম ভুইয়া মনে করেন, প্রযুক্তির চলাচল এড়িয়ে যাত্রা সম্ভব নয়। সব অফিসে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে যেন মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশের জনসংখ্যা অনেক বেশি, ফলে কাজের অনটন যদি থাকেও, মানুষ বাঁচার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার মানব সম্পদকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটাই অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

পোস্টটি শেয়ার করুন