কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগ বর্তমানে ব্যাপক চাপে ভুগছে স্থান সংকুলান ও শয্যা সংকটের কারণে। কোভিড-১৯ বা হাম সংক্রমণের শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে এই এলাকার শিশু রোগীসংখ্যা বেড়ে গেছে জোরেশোরে। সাধারণ ওয়ার্ডের পাশাপাশি তিনটি আইসোলেশন ইউনিট চালু থাকলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ; ফলে শিশু রোগীদের অনেককেই হাসপাতালের বারান্দা বা মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, শিশুদের জন্য নির্মিত এই আধুনিক ১০০ শয্যার হাসপাতাল ভবনটি দেড় বছর যাবত পড়ে আছে ব্যবহারের বাইরে। দায়িত্বহীনতার কারণে এই হাসপাতাল এখনো চালু করা যায়নি, যদিও এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
১১ এপ্রিল সরেজমিন দেখে জানা যায়, কুমেকের শিশু বিভাগে আসা রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে শয্যার সংকটের কারণে অনেক শিশুকে বাইরে, বারান্দায় বা মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। বর্তমানে অন্তত ৩২ জন শিশু আছেন, যারা কুমিল্লা, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর থেকে এসেছেন। শয্যার অভাবে তাদের অনেককেই চাটাই বা বিছানার বদলে নতিপ্রয়োজনের কারণে বাইরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি করছে।
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ এলাকার ৬ মাস বয়সি হামে আক্রান্ত শিশু আয়াতের মা ফারজানা আকতার জানান, শিশুটির অবস্থা গুরুতর, অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু পর্যাপ্ত স্থান না থাকার কারণে সমস্যা হচ্ছে। অন্যদিকে, ব্রাহ্মণের নবীনগর থেকে আসা ৫ মাস বয়সি রাজু অসুস্থ, তার বাবার অভিযোগ— ডাক্তাররা হাসপাতালে না পৌঁছে কুমিল্লায় পাঠিয়েছেন, কিন্তু সেখানে সিট পাওয়া যায়নি; ফলে বারান্দায়ই চিকিৎসা চলছে।
কুমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ বলেন, ‘সাধারণ সময়ে এখানে ৪০ শয্যার বিপরীতে তিনগুণ রোগী থাকেন, কোভিড-সদৃশ্য পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিডি কুমিল্লার বৃহত্তর অঞ্চলের রোগীরা ভালো চিকিৎসার আশায় এখানে ভিড় করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘পদুয়ার বাজার বেলতলীতে নির্মিত ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি চালু হলে সংক্রমিত রোগীদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সম্ভব হতো, পাশাপাশি কুমেকের ওপর চাপ অনেকটাই কমে যেত।’
তবে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে এই হাসপাতাল ভবনের অবকাঠামো সম্পন্ন থাকলেও চিকিৎসক, নার্স, যন্ত্রপাতি বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরবরাহের অভাবে এটি এখনো চালু হয়নি। দুই বছরেরও বেশি সময় আগে নির্মাণ শেষ হয়েও দায়িত্বের অভাবে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘২০২০ সালে ৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকায় এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। প্রথম দিকে হস্তান্তর ভাবনা থাকলেও দায়িত্বে ঘাটতির জন্য এখন পর্যন্ত কার্যকর করা যায়নি।’
কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির আহমেদ জানান, ‘প্রথমে কুমেক কর্তৃপক্ষ যখন দায়িত্ব নেননি, তখন আমাদের উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে চিঠি, দ্রুত ব্যবস্থা নিলে এই হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব।’
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যেখানে শিশু রোগীরা বারান্দায় ভোগান্তির মধ্যে চিকিৎসা নিচ্ছেন, সেখানে দেড় বছর ধরে অপেক্ষমাণ এই আধুনিক হাসপাতাল ভবন কেন বন্ধ থাকে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের মুখে উদ্বেগের কথা বলা হচ্ছে।





