শনিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২৬, ২৮শে চৈত্র, ১৪৩২

২ পুলিশ সদস্যের ফাঁসি, তিনজনের যাবজ্জীবন দণ্ড

জুলাই মাসে রংপুরে ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই রায়ে পুলিশে কর্মরত দুই সদস্য—সহকারী উপ-পরিদর্শক আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়—দুর্দান্ত সাজার দণ্ড পেয়েছেন, অর্থাৎ তাঁদের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, তিনজন অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তাঁরা হলেন সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং বিরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ট্রাইব্যুনাল—নেতৃত্বাধীন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে শহীদ আবু সাঈদ এর পরিবারের সদস্যরা গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রায়ের পর তাদের পক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দোলন মন্তব্য করেছেন, মামলার প্রমাণের মধ্যে অস্ত্র বা গুলির উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি। মামলায় মোট ২৫ জন ব্যক্তি অভিযুক্ত ছিলেন; তাঁদের মধ্যে সাতজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে দুইজন—বিশেষ করে সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু এবং রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান—১০ বছরের সাজার দণ্ড পেয়েছেন। অন্যদিকে, আরও ৮ আসামিকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক উপপুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী, বেরোবির সাবেক প্রক্টর এবং ছাত্রলীগের নেতা এমরান চৌধুরী। গতকাল দুপুর বারোটা বেজে আধা ঘণ্টার মধ্যে মামলার সংক্ষিপ্ত রায় প্রচার শুরু হয়। এই সময়ে গ্রেপ্তার ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় তোলা হয়। সেই অভিযুক্তরা হলেন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, সাবেক রেজিস্ট্রার মো. আনোয়ার পারভেজ, পুলিশ সহকারী উপপরিদর্শক আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র রায় এবং নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী (অ্যাকাউন্ট নামে আকাশ)। রায় পড়াকালে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী মন্তব্য করেন, ‘যে পুলিশ সদস্যদের সামনে আবু সাঈদ বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন, তারা অমানুষে রূপান্তরিত হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে জান দিয়ে পুলিশে থাকা অপরাধীদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁর সামনে যারা ছিলেন, তারা মানুষ—তাই তাঁর কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু তখন তিনি বুঝতে পারেননি, সেই মানুষগুলো অমানুষ হয়ে গেছে।’ মামলার পলাতক আসামি হিসেবে রয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক পুলিশ কমিশনার, পুলিশ কাউন্টার ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা, পাশাপাশি বেশ কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা। শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের বিচার রায় প্রকাশের পর, পরিবারের সদস্যরা তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ‘আসামিদের মধ্যে বড় বড় পুলিশ কর্মকর্তা এবং সরকারি উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরাই বেঁচে গেছেন। আমি চাই, সমস্ত দোষীদের ফাঁসি হোক। আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো।’ অন্যদিকে, আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘যারা এই হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে রায় হয়েছে। কিন্তু আমি তখনই শান্তি পাবো, যখন এই রায় কার্যকর হবে।’ উল্লেখ্য, এই মামলার অভিযোগপত্র গত বছরের ৩০ জুন বিচারিক আদালতে গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল। এরপর, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আবু সাঈদ। এই ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও এবং সাক্ষীদের বিবরণী এই মামলার মূল প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার আগে, মামলার অন্যান্য আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু হয়। এই মামলায় আদালত বলেছে, পুলিশের গুলির অস্তিত্ব এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। আসামিরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং গুলির অস্তিত্বের কোনও প্রমাণই তারা দেখাতে পারেননি। বিচারপতিগণ বলেছেন, তদন্তে প্রমাণের অভাবে এই মুহূর্তে গুলির অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, উচ্চ আদালত থেকে বিচারের ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে, এবং অভিযুক্তদের উপযুক্ত সাজা দেওয়া হবে। এই রায়ের মাধ্যমে বিচারকার্য যেন সম্পন্ন হয় ও গণঅভ্যুত্থানের এ আন্দোলন যেন আসলে সত্যিকার পরিবর্তনে রূপ নেয়, সেটাই প্রত্যাশা পরিবারের পক্ষ থেকেও व्यक्त হয়েছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন