সোমবার, ১৩ই এপ্রিল, ২০২৬, ৩০শে চৈত্র, ১৪৩২

চিরবিদায় নিলেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলে

বিশ্ব সংগীতের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল। দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময় ধরে

নিজের জাদুকরী ও বহুমুখী কণ্ঠের জাদুতে কোটি কোটি শ্রোতাকে মুগ্ধ করে রাখা ভারতীয়

সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই। আজ রোববার ৯২ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের

একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণের

মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশীয় সংগীতের একটি দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই শোকাবহ সংবাদটি নিশ্চিত করেছে।

আশা ভোঁসলের মৃত্যুর খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন তাঁর পুত্র আনন্দ ভোঁসলে।

তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানান যে, তাঁর মা আর আমাদের মাঝে নেই। পারিবারিক

সূত্র অনুযায়ী, আগামীকাল সোমবার বিকেল ৪টায় মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক শিবাজি পার্কে এই

মহীয়সী শিল্পীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। উল্লেখ্য যে, গত কয়েকদিন ধরেই তিনি শারীরিক

অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং বুকে সংক্রমণের

কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল।

চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে অবশেষে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন সুরের

এই জাদুকরী।

আশা ভোঁসলের সংগীত জীবন ছিল এক বিস্ময়কর মহাকাব্য। ১৯৪০-এর দশকে যখন তিনি ক্যারিয়ার

শুরু করেন, তখন তাঁর সামনে ছিল দিদি লতা মঙ্গেশকরের মতো এক বিশাল মহীরুহের ছায়া।

শুরুতে ছোট বাজেটের সিনেমায় কাজ করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়তে হলেও,

১৯৫০-এর দশকে সুরকার ওপি নায়ারের সান্নিধ্যে তিনি তাঁর স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন।

পরবর্তীতে কিংবদন্তি সুরকার আরডি বর্মণের সাথে তাঁর যুগান্তকারী কাজগুলো ভারতীয়

চলচ্চিত্র সংগীতে আধুনিকতা এবং পাশ্চাত্য সুরের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি করে।

সংগীতের প্রতিটি ধারায় তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। ধ্রুপদী সংগীত থেকে শুরু করে গজল, পপ

কিংবা ক্যাবারে—সবখানেই তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

তাঁর কণ্ঠের কালজয়ী গানগুলো আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সমাদৃত। ‘দম মারো দম’,

‘পিয়া তু আব তো আজা’ কিংবা ‘ইন আঁখো কি মস্তি’র মতো হাজার হাজার গান রেকর্ড করে

তিনি নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। শুধু হিন্দি সিনেমাতেই নয়, বরং বিশ্বের

অসংখ্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি। দীর্ঘ এই সাত দশকের বেশি সময়

ধরে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, বরং তিনি

ছিলেন সংগীতের একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। সময়কে অতিক্রম করে যাওয়ার এক বিরল ক্ষমতা

ছিল তাঁর কণ্ঠে।

সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আশা ভোঁসলে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য

রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র

সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ ছাড়াও রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক

সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ অর্জন করেছেন। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র

পুরস্কার ও অসংখ্য ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড। তাঁর মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও

রাষ্ট্রপতিসহ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গভীর শোক প্রকাশ

করেছেন। সুরের সম্রাজ্ঞী হিসেবে পরিচিত আশা ভোঁসলে তাঁর কাজের মাধ্যমে কোটি মানুষের

হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।

পোস্টটি শেয়ার করুন