কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর (৫২) নামে এক কথিত সুফি সাধককে পিটিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর এলাকায় তার নিজ দরবার শরিফে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় শামীমের দুই অনুসারীও গুরুতর আহত হন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শামীম রেজা দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ‘কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরী’র অনুসারী পরিচয়ে এলাকায় একটি দরবার পরিচালনা করতেন। অনুসারীদের কাছে তিনি ভিন্নধর্মী মতবাদ প্রচার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, তিনি নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতসহ ইসলামের মৌলিক ইবাদত অস্বীকার করতেন এবং অনুসারীদের হজ পালনের জন্য মক্কায় না গিয়ে স্থানীয় একটি বাঁশবাগানে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিতেন। এমনকি মৃত্যুর পর অনুসারীদের দাফনেও প্রচলিত ইসলামী নিয়ম উপেক্ষা করতেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কথিত এই পীর কখনও নিজেকে আল্লাহ, কখনও নবী, আবার কখনও ভগবান দাবি করতেন। এসব কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ক্ষোভ জমছিল। সম্প্রতি তার দরবারে পবিত্র কোরআন শরিফ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা চরমে ওঠে।
এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার দুপুর ১টার দিকে বিক্ষুব্ধ জনতা শামীমের দরবার শরিফ ঘেরাও করে। এক পর্যায়ে তারা দরবারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও একাধিক কক্ষে অগ্নিসংযোগ করে। এসময় ভেতরে থাকা শামীম ও তার দুই অনুসারীকে এলোপাথাড়ি পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়।
পরে বিকেল ৩টার দিকে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে শামীম রেজার মৃত্যু হয়। আহত অন্য দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে শামীম ইসলামের নাম ব্যবহার করে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। এর আগেও গান-বাজনা করে মরদেহ দাফনসহ বিভিন্ন আচরণ নিয়ে তিনি সমালোচিত হন। শামীমের বড় ভাই ফজলুর রহমান জানান, শামীম ঢাকা থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করতেন। পরে এলাকায় ফিরে এসে দরবার পরিচালনা শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে বিতর্কিত ধর্মীয় কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন।
জানা যায়, ২০২১ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা হয়। সে সময় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি পুনরায় একই ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু করেন।
ঘটনার পর বিকেল ৫টা পর্যন্ত এলাকাবাসী দরবার শরিফ ঘিরে রাখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দৌলতপুর থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, “পরিস্থিতি বর্তমানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।”
বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এর আগেও এমন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলা নামে এক কথিত পীরের মরদেহ কবর থেকে তুলে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে ফেলে বিক্ষুব্ধ জনতা। একইভাবে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামে এক শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করে বিবস্ত্র অবস্থায় গাছে ঝুলিয়ে তার লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজবাড়ী ও ময়মনসিংহের ঘটনাসহ কথিত পীর, বাউল-ফকিরদের ওপর হামলা, জোর করে চুল কেটে দেওয়া বা খুন-জখমের মতো বেশ কয়েকটি মব-সহিংসতা ঘটে। সর্বশেষ সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি দৃষ্টান্ত কুষ্টিয়ার এই ঘটনা।





