বুধবার, ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬, ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩

পর্দার আড়ালে সিরিয়াল কিলারের থাবা: ‘দ্য টিকটক কিলার’ তথ্যচিত্রে উঠে এল রোমহর্ষক সত্য

বিশ্বভ্রমণ বা একাকী যাত্রা অনেকের কাছেই রোমাঞ্চকর এবং স্বাধীনতার প্রতীক। কিন্তু

এই রোমাঞ্চের আড়ালে যে কতটা ভয়ংকর বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে, তার এক শীতল ও বাস্তব

চিত্র তুলে ধরেছে নেটফ্লিক্সে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া তথ্যচিত্র সিরিজ ‘দ্য টিকটক

কিলার’। স্পেনের এক নারীর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই

সিরিজটি শুধু একটি অপরাধের গল্প নয়, বরং ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর

অন্ধ বিশ্বাসের চরম পরিণতির এক প্রামাণ্য দলিল।

ঘটনার সূত্রপাত হয় ৪২ বছর বয়সী ভ্রমণপ্রেমী নারী এস্থার এসতেপাকে কেন্দ্র করে।

ব্যক্তিগত জীবনে ভ্রমণের নেশা থেকে তিনি একা স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরতে

গিয়েছিলেন। সেখানে একটি হোস্টেলের লবিতে পরিচয় হয় হোস হুরাডো মন্টিলার সঙ্গে।

মন্টিলা ছিলেন একজন জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও ট্রাভেল ব্লগার। প্রথম

পরিচয়েই তিনি এস্থারের বিশ্বাস অর্জন করেন। তাঁর প্রাণবন্ত আচরণ এবং সামাজিক

যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা বিভিন্ন রোমাঞ্চকর ভ্রমণকাহিনি এস্থারকে এতটাই মুগ্ধ

করেছিল যে, তিনি মন্টিলাকে তাঁর পরবর্তী যাত্রার সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে দ্বিধা

করেননি। কিন্তু এস্থারের সেই ভ্রমণই ছিল তাঁর জীবনের শেষ সফর।

২০২৩ সালের আগস্ট মাসে মন্টিলা এবং এস্থার একত্রে দীর্ঘ পথ হাঁটার পরিকল্পনা নিয়ে

যাত্রা শুরু করেন। যাত্রাপথে এস্থার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে স্থানীয় একটি

হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর থেকেই এস্থারের আচরণ ও তাঁর

পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ধরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এস্থারের

পরিবারের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বেশ কিছু অদ্ভুত বার্তা আসতে শুরু করে। সেখানে

দাবি করা হয় যে, এস্থার আর্থিক সংকটে পড়েছেন এবং তিনি সব ছেড়ে নতুন জীবন শুরু করতে

আর্জেন্টিনার উদ্দেশে রওনা দিচ্ছেন। তবে তাঁর মা হোসেপা পেরেজ বার্তাগুলোর ভাষা ও

ধরণ দেখে তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারেন যে এগুলো তাঁর মেয়ের লেখা নয়। এরপর থেকেই এস্থারের

আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

পুলিশ শুরুতে এই নিখোঁজ সংবাদকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি এবং ধারণা করেছিল এস্থার

হয়তো স্বেচ্ছায় নিরুদ্দেশ হয়েছেন। তবে পরিবারের সদস্যরা দমে না গিয়ে নিজেরাই

অনুসন্ধানে নামেন। তাঁরা খুঁজে পান সেই রহস্যময় মন্টিলাকে, যিনি এস্থারের নিখোঁজ

হওয়ার আগে তাঁর শেষ সঙ্গী ছিলেন। মন্টিলা নিজেই পরিবারকে ফোন করে দাবি করেন যে,

তিনি এস্থারকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার পর আর কিছুই জানেন না। কিন্তু সন্দেহবশত

এস্থারের পরিবার ইন্টারনেটে মন্টিলা সম্পর্কে অনুসন্ধান শুরু করতেই বেরিয়ে আসে এক

হাড়হিম করা অতীত। জানা যায়, যাকে সবাই একজন সহানুভূতিশীল ট্রাভেল ব্লগার হিসেবে

চেনেন, তিনি আসলে একজন কুখ্যাত দণ্ডপ্রাপ্ত সিরিয়াল কিলার। মন্টিলা অতীতে চারটি

পৃথক হত্যাকাণ্ডের দায়ে দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড ভোগ করেছেন।

তদন্তে সবচেয়ে বড় মোড় আসে মন্টিলার নিজের পোস্ট করা টিকটক ভিডিওগুলোর মাধ্যমে।

অপরাধ করার পরও তিনি তাঁর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, লোকেশন ও জিও-ট্যাগ সহ ভিডিও

প্রতিনিয়ত পোস্ট করে যাচ্ছিলেন। গোয়েন্দারা এই ডিজিটাল ট্রেইল বা তথ্যের সূত্র ধরে

তল্লাশি চালিয়ে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি মানুষের খুলি এবং জুনে শরীরের বাকি

অংশ উদ্ধার করতে সক্ষম হন। ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটি নিখোঁজ

এস্থার এসতেপার দেহাংশ। মন্টিলা বর্তমানে এই হত্যাকাণ্ডসহ আরও বেশ কিছু মামলায়

অভিযুক্ত হয়ে কারাবন্দি রয়েছেন, যদিও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

তথ্যচিত্রটির নির্মাতা হেক্টর মুনিয়েত্তি এই মামলার প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ

সতর্কবার্তা প্রদান করেছেন। তাঁর মতে, ‘দ্য টিকটক কিলার’ সিরিজটি আমাদের মনে করিয়ে

দেয় যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যে জাঁকজমকপূর্ণ ও মার্জিত জীবন দেখি, তা অনেক সময়

সাজানো এবং চরম বিভ্রান্তিকর হতে পারে। একজন দুর্ধর্ষ খুনি কীভাবে ক্যামেরার সামনে

একজন দয়ালু পর্যটকের মুখোশ পরে থাকতে পারে, তা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার জন্য এক বড়

প্রশ্নচিহ্ন। এই সিরিজটি বিশ্বজুড়ে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা

হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে ডিজিটাল যুগের আপাত বন্ধুত্ব বাস্তবে কতটা প্রাণঘাতী হতে

পারে।

পোস্টটি শেয়ার করুন