বৃহস্পতিবার, ৭ই মে, ২০২৬, ২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩

অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে তৈরি হচ্ছে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার

চুক্তিবন্ধ বেকারিতে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে তৈরি হচ্ছে স্কুল ফিডিং

কর্মসূচির রুটি। নোংরা পরিবেশে তৈরি এসব প্যাকেটজাত খাদ্য খাওয়ার ফলে শিশুদের শরীরে

পুষ্টি জোগানের পরিবর্তে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাপ্তাহিক রুটিনে পচা

ডিম ও কৃত্রিমভাবে পাকানো কলা দেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী

প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এসব চিত্র নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার প্রাথমিক

বিদ্যালয়গুলোতে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের

উপস্থিতি বাড়াতে ও শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার ইকো সোশ্যাল

ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। এই সংস্থাটি কিশোরগঞ্জ

উপজেলার ১৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২১ হাজার ৩৩৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে

স্কুল ফিডিং কর্মসূচি (মিড ডে মিল) প্রকল্পের খাদ্য সরবরাহ করে আসছে। প্রকল্পের

নীতিমালা অনুযায়ী সপ্তাহে ৬ দিন রুটিন মোতাবেক রুটি, কলা, ডিম, দুধ সরবরাহ করে

থাকে।

গত ২৮ এপ্রিল ১ নম্বর উত্তর চাঁদখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরঞ্জাবাড়ি বটতলা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় ওই বিদ্যালয় দুটিতে চুক্তিবদ্ধ এনজিওর একজন কর্মী

ছোট ছোট চিকন (চাম্পা) কলা নিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কক্ষের সামনে দাড়িয়ে

আছেন। এ সময় দেখা যায় কলাগুলোর মধ্যে অনেক কলা থেথলে গিয়ে কালো হয়ে গেছে। দেখে মনে

হচ্ছে কলাগুলো কৃত্রিমভাবে পাকানো হয়েছে। এ সময় ওই কর্মীকে কলার সাইজ এত ছোট কেন

প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘কলা প্রতি বরাদ্দ ৫ টাকা তাই এর থেকে বড় কলা দেওয়া সম্ভব

নয়। অথচ সরকারিভাবে প্রতি পিস কলার বরাদ্দ ১০ টাকা ধরা রয়েছে।’

গত ২৯ এপ্রিল চাঁদখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চড়কবন প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাগুড়া

ইউনাইটেড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণির একাধিক

শিক্ষার্থী সাথে কথা বললে তারা জানান, আমরা কোনো কোনো দিন পুরো খাবার পাই না।

আমাদের রুটির প্যাকেট ছিড়ে একটি করে রুটি, দুধের প্যাকেট কেটে এককাপ করে দুধ ও ডিম

কেটে অর্ধেক করে দেয়। চাঁদখানা সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষার্থী আশা মনি, রাজিয়া

আক্তার বলে, ‘রুটির প্যাকেট একটি রুটি খেয়ে দেখি রুটিটি শক্ত ও টক তাই অন্যটি আর

খেতে পারিনি।’

মাগুড়া ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনন্ত কুমার রায় বলেন,

‘আমাদের বরাদ্দ সংকট তাই একজনের বরাদ্দ দুজনকে দিয়ে দেই।’ এটা করার কোনো নিয়ম আছে

কি না প্রশ্ন করলে তিনি তার কোনো জবাব দেননি।

চাঁদখানা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনিছুর রহমান ও রফিকুল ইসলাম বলেন,

‘শিক্ষার্থীদের অভিযোগ পেয়ে একটি প্যাকেট খুলে দেখি রুটিগুলো শক্ত ও টক হয়ে গেছে

তাই শিক্ষার্থীরা খেতে অনিহা প্রকাশ করেছে।’

পুষনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অভিভাবক মনোয়ার হোসেন ও সালমা বেগম বলেন,

‘পুষনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিনিয়ত নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হয়। কয়েকদিন আগে

ওই স্কুলে শিক্ষার্থীদের মাঝে পচা ডিম বিতরণ করা হলে আমরা বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে

অবহিত করি। বাচ্চারা এসব খাবার খেলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাই বিষয়টির তদন্ত করে

দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।’

ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোর্শেদা বেগম ঘটনার বিষয় স্বীকার করে বলেন, ‘পচা ডিম

বিতরণের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।’

এ সময় প্যাকেটের গায়ে দেখা যায়, স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে তৈরিকরা রুটিগুলো

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের তৃপ্তি বেকারি থেকে উৎপাদন করা হয়েছে।

৩০ এপ্রিল দুপুরে ওই বেকারির সামনে গিয়ে দেখা যায়, বেকারিটির সামনে মশামাছি ভ্যান

ভ্যান করছে। একদম গেট-সংলগ্ন স্থানে অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে শিশুদের জন্য

তৈরিকৃত রুটিগুলো রাখা হয়েছে। এ সময় উৎপাদন কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কাছে গিয়ে দেখা

যায়, শ্রমিকদের পরিহিত পোশাকগুলো ময়লা তারা ভালো করে মুখ হাত পরিষ্কার না করে

কারখানায় কাজ করছে। কারখানাটির টয়লেটগুলো অপরিষ্কার ও নোংরা।

কারখানাটির মালিক রফিকুল ইসলামের সাথে এসব বিষয়ে কথা বললে তিনি বলেন, ‘ভাই আমার

কাগজপত্র সব ঠিক আছে তবে আমার সাথে ওই সংস্থা কোনো চুক্তি করেনি। তারা আমার

কাগজপত্র নিয়ে অন্য কারও সাথে চুক্তি করেছে।’ কিন্তু প্যাকেটের গায়েতো আপনার

বেকারির নাম রয়েছে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমার কাছ থেকে ১০ হাজার প্যাকেট নেওয়া

হয় বাকিগুলো কে দেয় আমি জানি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভাই এগুলা নিয়ে লেখালেখি করলে

আমার বাকিটাকা তুলতে সমস্যা হবে। আপনারা দয়া করে এনজি প্রতিনিধি সাথে কথা বলেন।’

সরকারের সাথে চুক্তিবন্ধ এনজিও ইএসডিওর জেলা ম্যানেজার ও প্রকল্পের তদারকির

দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সামছুল আলমের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ‘ভাই আমরা

তৃপ্তি বেকারির সাথেই চুক্তি করেছি।’ এ রকম নোংরা পরিবেশে উৎপাদিত খাবার কীভাবে

শিশুদের খাওয়াচ্ছেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘ভাই আপনারা অনেক সিনিয়র সাংবাদিক

আপনারাতো জানেন বিষয়টি নিয়ে নিউজ হলে আগে আমরাই সমস্যায় পড়ব। আমাদের সংশোধনের সুযোগ

দেন।’ এর আগেওতো শুরুর দিকে পচা রুটি দিয়েছিলেন, বললে তিনি বলেন, ‘ভাই আগের

রুটিগুলো লালমনির হাট থেকে নিয়েছিলাম সমস্যার হওয়ার পর আর নেইনি।’

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদা খাতুনের সাথে কথা বলার জন্য তার

কার্যালয়ে গিয়ে তাকে না পেয়ে তার সাথে মোবাইলে কথা হলে স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে

নিম্নমানের খাবার সরবরাহের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকায় ট্রেনিংয়ে

এসেছি বলে কল কেটে দেন।’

উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফুর রহমানের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, গত কয়েকদিন আগে

স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে পচা ডিম সরবরাহ করা হয়েছিল বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে এটা

জেনেছি। আমি বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়গুলো সরেজমিনে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা

গ্রহণ করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব।’

পোস্টটি শেয়ার করুন