শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ইসরায়েলি কারাগারে ধর্ষণ-নির্যাতন, রেহাই পায়নি শিশুরাও

ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যা এবং পশ্চিম তীরে জমি দখল করে অবৈধ বসতি

স্থাপনের বহু অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ওপর ধর্ষণ

নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যেখানে রেহাই পায়নি শিশুরাও। এবার ফিলিস্তিনি

বন্দিদের ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত

হয়েছে।

ইসরায়েলি কারাগারে দেশটির সেনা, কারারক্ষী, বসতি স্থাপনকারী ও জিজ্ঞাসাবাদকারীদের

দ্বারা ফিলিস্তিনিদের ওপর ব্যাপক যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন

ভুক্তভোগীরা। পুলিৎজার বিজয়ী কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ প্রকাশিত একটি দীর্ঘ

অনুসন্ধানী মতামত প্রতিবেদনে যৌন নির্যাতনের শিকার ১৪ জন ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষের

সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।

কলামিস্ট ক্রিস্টফ লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে আমাদের ভিন্নমত থাকলেও

ধর্ষণের নিন্দায় আমাদের এক হওয়া উচিত। ইসরায়েলি নেতারা ধর্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন

বলে কোনো প্রমাণ না থাকলেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এমন একটি ‘নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি

করেছে যার মাধ্যমে যৌন সহিংসতা ইসরায়েলের ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’-এর

অংশে পরিণত হয়েছে।

১৪ সাক্ষ্যদাতার মধ্যে ভুক্তভোগী ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সামি আল-সাই বলেন, ২০২৪ সালে

আটক হওয়ার পর কারারক্ষীরা তার ওপর প্রায়শই নির্যাতন চালিয়েছে। তিনি বলেন, তারা

সবাই আমাকে মারছিল আর একজন আমার মাথা ও ঘাড়ের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে রেখেছিল।

কারারক্ষীরা আমাকে বিবস্ত্র করে বিভিন্ন বস্তু দিয়ে নির্যাতন করছিল এবং অট্টহাসিতে

মেতে উঠেছিল। এটা ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক ছিল। আমি মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করছিলাম।

ক্রিস্টফ এক ফিলিস্তিনি কৃষকের সাক্ষ্য তুলে ধরেছেন। কারারক্ষীদের যৌন নির্যাতনের

বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি ঐ কৃষক অভিযোগ করতে গেলে তাকে ধাতব লাঠি দিয়ে বারবার নির্যাতন

করা হয়। তার দাবি, শিন বেত (ইসরায়েলের অভ্যন্তীণ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য)

কর্মকর্তারা তাকে প্রকাশ্যে কথা না বলতেও হুমকি দিয়েছিল ।

প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের পর গ্রেপ্তার হওয়া এক ফিলিস্তিনি নারীর বক্তব্যও রয়েছে। ঐ

নারী বলেন, ইসরায়েলি সেনারা তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের ধর্ষণের হুমকি দিয়েছিল।

তার ভাষায়, তাকে বারবার বিবস্ত্র করা হয়, মারধর করা হয় এবং যৌন হেনস্তা করা হয়।

ঐ নারী বলেন, তাদের (ইসরায়েলি বাহিনীর সদস্যদের) হাত আমার পুরো শরীরে ছিল। গাজার

আরেক সাংবাদিকও আটক অবস্থায় নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, কেউ তাদের যৌন নির্যাতন

থেকে রেহাই পায়নি।

ক্রিস্টফ কয়েক জন ফিলিস্তিনি কিশোরের সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন। কিশোররা জানায়, আটক

অবস্থায় ধর্ষণের হুমকি ছিল নিয়মিত ঘটনা। ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরের ভাষ্য অনুযায়ী,

কারারক্ষীরা বলেছিল, এটা করো (যৌনতার ইঙ্গিত), না হলে এই লাঠি তোমার শরীরে ঢুকিয়ে

দেব। ক্রিস্টফ তার প্রতিবেদনে জাতিসংঘ, বি’তসেলেম, সেইভ দ্য চিলড্রেন, ইউরো মেইড

হিউম্যান রাইটস মনিটর এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জারনালিস্ট থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের

তথ্য সংযুক্ত করেছেন।

ইউরো-মেডের এক প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনী যৌন সহিংসতাকে

‘পদ্ধতিগত’ এবং ‘রাষ্ট্রসমর্থিত সংগঠিত নীতি’র অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

গুরুতর যৌন সহিংসতার ধারা নথিভুক্ত করেছে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বিতসেলেম।

অন্যদিকে সেভ দ্য চিলড্রেন জানায়, ইসরায়েলের হাতে আটক ফিলিস্তিনি শিশুদের মধ্যে

জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকেরও বেশি বলেছে তারা যৌন সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছে বা নিজেরা

এর শিকার হয়েছে।

তবে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েলের কারা

কর্তৃপক্ষ । নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে এক মুখপাত্র বলেন, তারা সুস্পষ্টভাবে

অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এসব

অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে অভিহিত করেছেন। ক্রিস্টফের মতে, দায়মুক্তির সংস্কৃতি এসব

নির্যাতন চালিয়ে যেতে সহায়তা করছে। ইসরায়েলে নির্যাতনবিরোধী পাবলিক কমিটির

নির্বাহী পরিচালক সারি বাশিই বলেন, ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক যৌন

নির্যাতন বাস্তব ঘটনা। কারাগারে এসব স্বাভাবিক করা হয়েছে।

রিজার্ভ সেনাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রত্যাহারের পর কড়া মন্তব্য করেন বাশিই।

বাশিইয়ের ভাষায়, অভিযোগ প্রত্যাহার করা মানে ধর্ষণের অনুমতি দেওয়া। প্রতিবেদনের

শেষে কলামিস্ট ক্রিস্টফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু আর্থিক ও সামরিকভাবে ইসরায়েলকে

সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, তাই এসব অভিযোগ মোকাবিলার দায় ওয়াশিংটনেরও রয়েছে। তিনি

বলেন, আমাদের আমেরিকান করের অর্থ ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোকে সহায়তা করছে। ফলে

এমন যৌন সহিংসতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও জড়িত।

পোস্টটি শেয়ার করুন