ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে দারিদ্র্য জয় করে বিশ্বজয়ের নায়ক হওয়ার গল্প অনেক থাকলেও,
২০২৬ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে সুযোগ পাওয়া ইগর থিয়াগোর জীবনকাহিনি যেন সব রূপকথাকেও হার
মানায়। মাত্র ২৪ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার যখন কোচ কার্লো আনচেলত্তির ২৬ জনের চূড়ান্ত
দলে জায়গা করে নিলেন, তখন বিশ্ববাসী দেখল ব্রাসিলিয়ার এক উপশহর থেকে উঠে আসা লড়াকু
এক যুবকের অভাবনীয় উত্থান। শৈশবে চরম অনটন, বাবার অকাল মৃত্যু আর রাজমিস্ত্রির
সহকারীর কাজ করা সেই কিশোর আজ পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের প্রধান ভরসা হয়ে
বিশ্বমঞ্চে পা রাখছেন।
ইগর থিয়াগোর শৈশব কেটেছে ব্রাসিলিয়ার উপশহর গামায় চরম দারিদ্র্যের মাঝে। মাত্র ১৩
বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর তাঁর পরিবার অকুল পাথারে পড়ে। সংসার চালাতে তাঁর মা
মারিয়া দিভাকে রাস্তায় ঝাড়ুদারের কাজ করতে হয়েছে। অভাবের তাড়নায় দিনের পর দিন
বিদ্যুৎহীন ঘরে থাকা এবং আত্মীয়স্বজনের কাছে অপমানিত হওয়া ছিল তাঁদের নিত্যদিনের
সঙ্গী। মায়ের এই কষ্ট দূর করার সংকল্প নিয়ে ইগর কিশোর বয়সেই রাজমিস্ত্রির সহকারী
হিসেবে কাজ শুরু করেন, পাশাপাশি বাজারে ফল বিক্রি এবং লিফলেট বিলির কাজও করেছেন।
ফুটবলের প্রতি তাঁর আবেগ থাকলেও বারবার বিভিন্ন ক্লাবের ট্রায়াল থেকে ব্যর্থ হয়ে
ফিরে এসে একপর্যায়ে খেলা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে মায়ের অনুপ্রেরণায়
তিনি দমে যাননি এবং কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে গেছেন।
ইগরের সাফল্যের যাত্রা শুরু হয় ২০১৮ সালে ভেরে ক্লাবের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৭
চ্যাম্পিয়নশিপে ১৩ গোল করার মাধ্যমে। এরপর তিনি ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব
ক্রুজেইরোতে যোগ দেন, কিন্তু সেখানেও পরিস্থিতি তাঁর অনুকূলে ছিল না। ক্লাবটি
আর্থিক সংকটে পড়ে রেলিগেটেড হয়ে গেলে ইগরকে তীব্র সমালোচনার শিকার হতে হয়। তবে
কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদো নাজারিও ক্লাবটির মালিকানা নেওয়ার পর ইগরের প্রতিভা
চিনতে ভুল করেননি এবং তাকে ৭ লাখ ডলারে বুলগেরিয়ার ক্লাব লুদোগোরেতসে বিক্রি করেন।
ইউরোপে পা রাখাই ছিল ইগরের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট; সেখানে ট্রেবল জেতার পর
বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুগাতে গিয়ে এক মৌসুমে ২৯ গোল করে তিনি সবার নজর কাড়েন।
২০২৪ সালে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব
ব্রেন্টফোর্ডে যোগ দেন ইগর। তবে ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর এক বিরল জয়েন্ট ইনফেকশন এবং
হাঁটুর চোটের কারণে টানা ২৭৩ দিন মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাঁকে। কিন্তু অদম্য ইগর চোট
কাটিয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে দুর্দান্তভাবে ফিরে আসেন। এই মৌসুমে তিনি
একাই ২২ গোল করেন, যা কোনো ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়ের প্রিমিয়ার লিগে করা এক মৌসুমের
সর্বোচ্চ গোল। এমনকি আর্লিং হালান্ডকে পেছনে ফেলে তিনি মাসসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও
অর্জন করেন। গত মার্চে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জাতীয় দলের হয়ে পেনাল্টি থেকে করা গোলটি
ছিল তাঁর দীর্ঘ লড়াই ও ত্যাগের এক সার্থক বহিঃপ্রকাশ।
৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার ইগর থিয়াগো বর্তমানে ব্রাজিলের একজন ক্লাসিক ‘নম্বর নাইন’
হিসেবে পরিচিত। এরিয়াল বলে আধিপত্য, শক্তিশালী ফিজিক্যাল প্লে এবং প্রতিপক্ষের
রক্ষণ ভেঙে গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে আনচেলত্তির কৌশলী পরিকল্পনার প্রধান অংশ
করে তুলেছে। যারা একসময় তাঁকে সামর্থ্য নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিল, আজ তারা ইগরের
বিশ্বজয়ের অপেক্ষায়। নিজের মেধা আর বিশ্বাসের জোরে রাজমিস্ত্রির সহকারী থেকে আজ
বিশ্বকাপের মূল আসরে ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করতে যাওয়া এই তরুণ এখন কোটি মানুষের
অনুপ্রেরণা।





