শুক্রবার, ২৯শে মে, ২০২৬, ১৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, অপেক্ষা ট্রাম্পের অনুমোদনের

চলমান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বৃদ্ধি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক

আলোচনার লক্ষ্যে ৬০ দিন মেয়াদী একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও

ইরানের প্রতিনিধিরা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো এই চুক্তিতে

তাঁর চূড়ান্ত সম্মতি প্রদান করেননি বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন দুজন মার্কিন

কর্মকর্তা ও মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আঞ্চলিক সূত্র। ইরানও এখন

পর্যন্ত এই সমঝোতা চুক্তিটি গ্রহণ করার বিষয়টি দাপ্তরিকভাবে নিশ্চিত করেনি। এই

সমঝোতা স্মারকটি যদি স্বাক্ষরিত হয়, তবে তা হবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা শুরু

হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য। অবশ্য

ট্রাম্পের পারমাণবিক সংক্রান্ত শর্তগুলোর স্থায়ী সমাধান করে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে

পৌঁছাতে হলে ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হবে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন

মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ‘এটি মূলত সবাইকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার একটি চুক্তি।

মূল আলোচনার টেবিলেই আমরা বাকি খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সমাধান করব।’

মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, গত মঙ্গলবার নাগাদ এই চুক্তির শর্তাবলি প্রায়

চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল, তবে উভয় পক্ষেরই শীর্ষ নেতৃত্বের গ্রিন সিগন্যালের প্রয়োজন

ছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ইরানি প্রতিনিধিরা পরবর্তীতে ফিরে এসে

জানান যে এতে তাঁদের সমর্থন রয়েছে এবং তাঁরা স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত। যদিও ইরান এই

দাবির যথার্থতা নিশ্চিত করেনি। এদিকে মার্কিন আলোচকেরা প্রস্তাবিত চুক্তির

বিস্তারিত তথ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবহিত করলেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তাতে সই

করেননি। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়েছেন,

বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য তার আরো দু-এক দিন সময় প্রয়োজন। ইতিপূর্বেও

যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা চুক্তির অত্যন্ত কাছাকাছি

পৌঁছেছেন বলে মনে করলেও বারবার আলোচনা থমকে গিয়েছিল।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুসারে, এই ৬০ দিনের সমঝোতা স্মারকে বেশ কিছু

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ

চলাচল হবে সম্পূর্ণ ‘অবাধ ও উন্মুক্ত’, যার অর্থ হলো কোনো ধরনের শুল্ক (টোল) আদায়

করা যাবে না এবং কোনো জাহাজকে হয়রানি করা চলবে না। একই সঙ্গে ইরানকে আগামী ৩০ দিনের

মধ্যে এই প্রণালি থেকে সমস্ত সামুদ্রিক মাইন অপসারণ করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া

মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে, তবে তা হবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিকতার

সমান্তরালে। পাশাপাশি ইরান যাতে অবাধে তেল বিক্রি করতে পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র

কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে। পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে সমঝোতা

স্মারকে ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই ৬০

দিনের সময়সীমার মধ্যে প্রথম পর্যায়ের আলোচনা হবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কীভাবে

স্থানান্তর বা ধ্বংস করা যায় এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা

হবে তা নিয়ে। এর বিনিময়ে আলোচনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

এবং ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা তহবিল মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করতে সম্মত হবে। এছাড়া

ইরান যাতে আন্তর্জাতিক পণ্য ও মানবিক সহায়তা পেতে পারে, সে জন্য একটি বিশেষ

কার্যপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং এই সমঝোতা স্মারকে লেবাননে ইসরায়েল ও

হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিও উল্লেখ থাকবে।

এদিকে চুক্তিটি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, ঠিক তখনই গত ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালিতে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুটি ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একজন মার্কিন

কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ইরানের সামনে এখন তাদের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি

বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরে এমন কিছু মানুষ

আছেন, যারা বোঝেন এখন তাদের ভিন্ন পথে হাঁটার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ ৬০ দিনের আলোচনার

সময়ই আমরা বুঝতে পারব আসলে কী ঘটে। ইরান আলোচনায় যত বেশি ছাড় দিতে রাজি হবে, তারা

তত বেশি সুবিধা পাবে। তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে,

আলোচনার সময় যদি এটি প্রতীয়মান হয় যে ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে তাদের প্রতিশ্রুতি

রক্ষা করতে পারছে না, তবে ট্রাম্পের সামনে অর্থনৈতিক ও সামরিক—সব পথই খোলা থাকবে।

এই অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি কেবল একটি চূড়ান্ত ও

স্থায়ী চুক্তির ওপরই নির্ভর করছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন