দক্ষিণ আফ্রিকায় অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চলমান তীব্র বিক্ষোভের মুখে
সংঘটিত ভয়াবহ ‘জেনোফোবিক’ বা অভিবাসীবিদ্বেষী হামলায় অন্তত পাঁচজন মোজাম্বিকানের
নির্মম মৃত্যু হয়েছে। মোজাম্বিক সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকায়
চলমান এই সহিংসতায় নিজ দেশের নাগরিকদের অফিশিয়ালি নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা
হয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর মোসেল বে-তে ছড়িয়ে পড়া এই ভয়াবহ
সহিংসতায় প্রায় ৮০০ মোজাম্বিকান নাগরিক চরম বিপদের মুখে পড়েন।
মোজাম্বিক সরকারের প্রেস অফিস থেকে মঙ্গলবার (০২ জুন) প্রকাশিত এক জরুরি বিবৃতিতে
বলা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় উদ্ভূত উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে
মোট সাতজন মোজাম্বিকান নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এদের মধ্যে পাঁচজন সরাসরি বর্ণবাদী
ও অভিবাসীবিদ্বেষী হামলার শিকার হয়ে মারা গেছেন এবং বাকি দুজন ওই সহিংসতা থেকে
বাঁচতে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে মোজাম্বিকে ফিরে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায়
নিহত হন। এই ভয়াবহ সহিংসতার জেরে গত শনিবার (৩০ মে) ৩০০ জন মোজাম্বিকান নাগরিক
সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ও ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে স্বদেশে
ফিরে এসেছেন।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে বাকি ৫০০ জনেরও বেশি মোজাম্বিকান
নাগরিককে দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েস্টার্ন কেপ প্রদেশের একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে
সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং গতকাল ১ জুন থেকে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে মোজাম্বিকে
ফিরিয়ে আনার রাষ্ট্রীয় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা পুলিশ রোববার (৩১ মে) জানিয়েছে, কেপটাউন থেকে প্রায় ৩৮০
কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত মোসেল বে বন্দরের একটি অস্থায়ী বসতিতে দুই ব্যক্তির
রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তারা গভীর তদন্ত শুরু করেছে, তবে এই মৃত্যুগুলো সরাসরি
অভিবাসীবিদ্বেষী বিক্ষোভের সাথে যুক্ত কি না বা নিহতরা কোন দেশের নাগরিক তা পুলিশ
এখনো স্পষ্ট করেনি।
ভয়াবহ এই হামলার ঘটনায় মোসেল বে শহরের স্থানীয় মেয়র ডার্ক কোটজে তীব্র উদ্বেগ,
ক্ষোভ ও গভীর হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, যেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে নিরপরাধ মানুষকে
হত্যা করা হচ্ছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং অসংখ্য পরিবারকে জোরপূর্বক
বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে, এমন বর্বরোচিত অভিবাসীবিদ্বেষী হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য
নয়।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ আফ্রিকার বাণিজ্যিক রাজধানী জোহানেসবার্গ, ডার্বিন এবং ইস্টার্ন
কেপ প্রদেশের বিভিন্ন অংশে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অবৈধ অভিবাসীদের তাড়িয়ে দেওয়ার
দাবিতে যে সহিংস বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, এই অঞ্চলের বর্তমান হামলাগুলো তারই একটি
ধারাবাহিক রূপ।
দক্ষিণ আফ্রিকায় এই ধরনের বর্ণবাদী ও জেনোফোবিক সহিংসতার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। এর আগে
২০০৮ সালে দেশজুড়ে ভয়াবহ অভিবাসীবিদ্বেষী সহিংসতায় কয়েক ডজন প্রবাসী নিহত এবং
হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৫ এবং ২০২১ সালেও দেশটিতে
অনুরূপ মারাত্মক দাঙ্গা ও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকায় আগামী নভেম্বর মাসে
অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল
সাধারণ ভোটারদের সস্তা সমর্থন ও রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই এই ক্ষতিকর অভিবাসী বিরোধী
সেন্টিমেন্ট ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নতুন করে উসকে দিচ্ছে।





