ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপের উপকূলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী
ভূমিকম্পে অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। সোমবার (৮ জুন) সকালে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পের
পর ফিলিপাইনসহ ইন্দোনেশিয়া, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ায় সুনামি সতর্কতা জারি করা
হয়। পরে কয়েকটি অঞ্চলে সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ফিলিপাইনের সিভিল ডিফেন্স অফিস জানিয়েছে, ভূমিকম্পে অন্তত ৩২ জন নিহত এবং ১৩৪ জন
আহত হয়েছেন। এছাড়া ৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পে ৩৭টি
ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার বেশিরভাগই বাণিজ্যিক স্থাপনা।
ইউএসজিএস জানায়, সোমবার (৮ জুন) স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে এই ভূমিকম্পটি আঘাত
হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার গভীরে।
ফিলিপাইনের সিসমোলজি সংস্থা ‘ফিভলকস’ জানিয়েছে, মিন্দানাও দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে
অবস্থিত সারাঙ্গানি প্রদেশের জেনারেল সান্তোস সিটির উপকূলে এই ভূমিকম্পটি আঘাত
হানে। সারাঙ্গানি প্রদেশের আলাবেল শহরের পুলিশ প্রধান বেনজি আনচেতা টেলিফোনে বার্তা
সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘এটি আমাদের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।’
তিনি জানান, ভূমিকম্পের সময় থানায় পতাকা উত্তোলন কর্মসূচি চলছিল এবং তীব্র
ঝাঁকুনিতে থানার ভবনে ফাটল দেখা দেয়। কোনো মৃত্যুর খবর না পাওয়া গেলেও শক্তিশালী
কম্পনের আতঙ্কে কয়েকজন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
সারাঙ্গানি প্রদেশে প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে, যেখানে ক্ষয়ক্ষতির
ছবিগুলো প্রথম সামনে এসেছে।
ভূমিকম্পের পর জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধারকাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন ফিলিপাইনের
রাষ্ট্রপতি ফার্ডিনান্ড মার্কোস জুনিয়র। আক্রান্ত এলাকার নাগরিকদের উদ্দেশে দেওয়া
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত প্রদেশগুলোর আমাদের দেশবাসী, দয়া করে সুনামির
সতর্কবার্তায় কান দিন। এখনই উঁচু স্থানে চলে যান। দেরি করবেন না। পেছনে ফেলে যাওয়া
যেকোনো কিছুর চেয়ে আপনাদের জীবন অনেক বেশি মূল্যবান।’
মার্কিন সুনামি সতর্কীকরণ ব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইনের কিছু অংশে জোয়ারের
স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে ১ থেকে ৩ মিটার উঁচুতে সুনামি ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে। ফিভলকসও
উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এদিকে ইন্দোনেশিয়া তাদের উত্তর-পূর্ব উপকূলে এবং জাপান তাদের দক্ষিণ উপকূলে
(ইবারাকি থেকে ওকিনাওয়া প্রশাসনিক অঞ্চল পর্যন্ত) সুনামি সতর্কতা জারি করেছে। তবে
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপে কোনো সুনামির হুমকি নেই বলে জানিয়েছে সে দেশের
ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস।
উল্লেখ্য, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং জাপান—তিনটি দেশই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের
অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘রিং অব ফায়ার’-এ অবস্থিত। এই এলাকায় টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত
নড়াচড়ার কারণে ঘন ঘন শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে
থাকে।
ফিলিপাইনে ভবন ধস, একের পর এক আফটারশক
ফিলিপাইন ইনস্টিটিউট অব ভলকানোলজি অ্যান্ড সিসমোলজির তথ্য অনুযায়ী, মূল ভূমিকম্পটির
পর এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে। এগুলোর মাত্রা রিখটার স্কেলে
১ দশমিক ৩ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৭ পর্যন্ত ছিল।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি থাকা জেনারেল সান্তোস সিটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের
চিত্র সামনে এসেছে। সরকারি বার্তা সংস্থা ফিলিপাইন ইনফরমেশন এজেন্সির প্রকাশিত
ভিডিওতে দেখা গেছে, শহরের বড় বড় ভবন ও বিপণিবিতান ধসে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়,
ফিলিপাইনের অত্যন্ত জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড চেইন জলিবির অন্তত দুটি শাখা হুড়মুড় করে ভেঙে
সড়কের ওপর ধসে পড়ছে।
জেনারেল সান্তোস সিটির পুলিশ কর্মকর্তা মাস্টারসার্জেন্ট রবার্ট ডাগন জানান, বেশ
কয়েকটি ভবন ধসে পড়ায় সেখানে জরুরি উদ্ধারকাজ চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ফিলিপাইন রেড
ক্রস দেশজুড়ে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ জারি করে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।
ফিলিপাইনে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ায় সুনামি
ফিলিপাইনে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পের জেরে প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে
সুনামি সৃষ্টি হয়েছে। ফিলিপাইনের এই শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ার তিনটি
উপকূলীয় এলাকায় সুনামির ঢেউ শনাক্ত করা হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া, জলবায়ু ও
ভূপ্রকৃতিবিদ্যা সংস্থা (বিএমকেজি) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বিএমকেজি জানায়, স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে ইন্দোনেশিয়ার উত্তর
মালুকু প্রদেশের কেডি, উলু সিয়াউ এবং মেলোঙ্গুয়ানে এলাকায় সুনামি ঢেউ আঘাত হানে।
তবে এই ঢেউগুলোর উচ্চতা ছিল জোয়ারের চেয়ে ০ দশমিক ০৯ মিটার থেকে ০ দশমিক ১৯ মিটার
পর্যন্ত। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
জাপানেও সুনামির সতর্কতা
ফিলিপাইনের এই ভূমিকম্পের পর সম্ভাব্য সুনামি নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে জাপান
সরকার। জাপানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় ওকিনাওয়া দ্বীপপুঞ্জ এবং
প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী প্রদেশগুলোতে এক মিটার উচ্চতার সুনামির ঢেউ আঘাত
হানতে পারে। এই আশঙ্কায় উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে
যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।





