মঙ্গলবার, ৯ই জুন, ২০২৬, ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

খাদ্যবাহিত রোগে বছরে ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু: গবেষণা প্রতিবেদন

অস্বাস্থ্যকর কোনো খাবার খাওয়ার পর খাদ্যবাহিত রোগ যে শুধু একটি বিরক্তিকর সমস্যা

তা নয়। এটি অনেক সময় গুরুতর রোগ থেকে শুরু করে মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হতে পারে। দ্য

ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন দেখা গেছে, ২০২১ সালে

বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু খাদ্যবাহিত রোগের কারণে হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘দূষিত খাবার থেকে সৃষ্ট এই বিশাল রোগের বোঝা কমাতে

খাদ্যনিরাপত্তা উন্নয়নের জন্য দেশগুলোর কৌশলগুলো বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।’

সংখ্যাটি উদ্বেগজনক হলেও বিশেষজ্ঞদের কাছে এটি বিস্ময়কর নয় বলে জানান নিউইয়র্কের

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় আরভিং মেডিকেল সেন্টারের সিস্টেমস বায়োলজি বিভাগের

চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ডা. হ্যারিস ওয়াং। তিনি এই গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন না।

কানাডার কুইবেকে লাভাল বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. জুলি জিন

বলেন, বিশ্বের একটি বড় অংশ হয়তো এই মৃত্যুর হার এবং এর সামগ্রিক বোঝা-যার অর্থ

মৃত্যু এবং সেইসাথে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ও প্রতিবন্ধকতা-সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনকাল

বা ডিঅ্যাবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স দেখে অবাক হতে পারে।

হ্যারিস ওয়াংয়ের মতো জিনও এ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। তার মতেও, এর প্রভাব এইচআইভি

বা ম্যালেরিয়ার মতো অন্যান্য বড় সংক্রামক রোগের প্রভাবের সঙ্গে তুলনীয়।

তিনি আরও বলেন, অনেক ঘটনা মৃদু হওয়ায় বা রিপোর্ট না হওয়ায় খাদ্যবাহিত রোগের

প্রকৃত প্রভাব প্রায়ই অবমূল্যায়িত হয়। কিন্তু এই তথ্যগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে

খাদ্যবাহিত রোগ শুধু একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি সামষ্টিক ও কাঠামোগত

সমস্যাও। তবে এই ধরনের অসুস্থতা প্রতিরোধে ঘরেই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

খাদ্যবাহিত অসুস্থতার কারণ

জিন বলেন, খাবার যখন বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান দ্বারা দূষিত হয়, তখন মানুষ

খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে পরজীবী, রাসায়নিক পদার্থ এবং

অণুজীব। সাধারণ উদাহরণ হিসেবে সালমোনেলা, ইশেরিশিয়া কোলাই, নোরোভাইরাস এবং

লিস্টেরিয়ার কথা উল্লেখ করা যায়।

ওয়াং বলেন, এসব রোগজীবাণু গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা সৃষ্টি

করতে পারে। তবে এগুলো আরও গুরুতর জটিলতায় রূপ নিতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে সেপসিস

এবং ব্যাকটেরেমিয়া—যে অবস্থায় ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে।

কিছু খাদ্যবাহিত রোগের ক্ষেত্রে সমস্যার মূল কারণ হলো তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে

ব্যর্থতা। অর্থাৎ খাবার যথেষ্ট পরিমাণে রান্না না করা বা এমন তাপমাত্রায় রেখে

দেওয়া, যা ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল। অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে খাবার

প্রস্তুত ও পরিবেশনের সময় স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে বলে

জানান জিন।

বিশ্বব্যাপী খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সুযোগ সমান নয়। জিন বলেন, নিম্ন ও

মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে মৃত্যু ও গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। বিভিন্ন দেশের

খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়মকানুন এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতার পার্থক্য এসব

রোগের বিস্তারে প্রভাব ফেলে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে

ঝুঁকি ব্যক্তিভেদেও ভিন্ন হতে পারে। ওয়াং বলেন, ‘যেসব ছোট শিশুর রোগপ্রতিরোধ

ব্যবস্থা পুরোপুরি বিকশিত হয়নি, যেসব বয়স্ক মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে

এবং যাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল, তারা খাদ্যবাহিত রোগে বিশেষভাবে বেশি

আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।’

জিন আরও বলেন, গর্ভাবস্থা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে, ফলে

গর্ভবতী নারীরাও গুরুতর খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

ওয়াং বলেন, কিছু ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অন্ত্রের অণুজীবের

স্বাভাবিক ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এতে খাবারে থাকা রোগজীবাণুর কারণে অসুস্থ

হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। খাদ্যবাহিত রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে বমি বমি

ভাব, বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা এবং জ্বর।

টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুষদের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত দুই থেকে

সাত দিনের মধ্যে এসব উপসর্গ সেরে যায়। তবে তিন দিনের বেশি স্থায়ী ডায়রিয়া,

উচ্চমাত্রার জ্বর বা মলে রক্ত দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণ অত্যন্ত

গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান ওয়াং। তিনি বলেন, ‘শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে উপসর্গ

ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটি সারা শরীরে ধাক্কার মতো

প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে।’

রান্নাঘরে প্রতিরক্ষা

খাবার প্রস্তুত ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনই হলো প্রথম প্রতিরক্ষা

ব্যবস্থা বলে জানান জিন। সাধারণভাবে আধা-সেদ্ধ বা অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা মাংস ও

ডিম, কাঁচা ময়দা এবং অপরিশোধিত দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। পাশাপাশি শাকসবজি

ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। যাদের ঝুঁকি বেশি, তাদের কাঁচা মাছ, বাজারে প্রস্তুত

বিক্রয়যোগ্য পাতলা কাটা মাংসজাত খাবার (পুনরায় গরম না করলে) এবং আগে থেকে

প্যাকেটজাত সালাদও এড়িয়ে চলা ভালো বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ

প্রশাসন।

টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কিছু খাবার দীর্ঘ সময় কক্ষ তাপমাত্রায়

রেখে দেওয়া নিরাপদ নয়—পরে গরম করে জীবাণু ধ্বংস করার চেষ্টা করা হলেও। কোনো খাবার

কাটা, খোসা ছাড়ানো বা রান্না করার পর সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার না করলে দুই ঘণ্টার

মধ্যে তা হিমায়িত সংরক্ষণে রাখতে হবে।

ওয়াং বলেন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে খাদ্যবাহিত রোগের বিরুদ্ধে শরীরের

প্রতিরোধক্ষমতাও শক্তিশালী করা সম্ভব। অন্ত্রের অণুজীবের সুস্থ ভারসাম্য এবং

শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য কোনো একক ‘অলৌকিক খাদ্য’ নেই। এর মূল

চাবিকাঠি হলো ভারসাম্য, বৈচিত্র্য এবং ধারাবাহিকতা।

খাদ্যতালিকায় এমন বিভিন্ন ধরনের খাবার রাখা উচিত, যা শরীরকে প্রয়োজনীয় ক্ষুদ্র

পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করবে এবং রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা

করবে বলে পূর্বের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের

চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুষদের পুষ্টিবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার গার্ডনার।

এসব পুষ্টি সাধারণত তাজা ও বৈচিত্র্যময় ফল ও শাকসবজি, পূর্ণ শস্যজাত খাবার,

চর্বিহীন আমিষ এবং স্বাস্থ্যকর তেল থেকে পাওয়া যায়। ওয়াং আরও বলেন, ‘যথাযথ

পুষ্টি গ্রহণ, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুম—এসব সাধারণ অভ্যাসই ভালো

স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত কার্যকর।’

পোস্টটি শেয়ার করুন