এখন থেকে ইরান যখন খুশি হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার
ক্ষমতা রাখে। সম্প্রতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এক মূল্যায়নে এ তথ্য জানানো
হয়েছে। এ তথ্যের বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, যুদ্ধের ফলে বিশ্ব
অর্থনীতিতে ভয়াবহ আঘাত হানার এক নতুন ও শক্তিশালী হাতিয়ার হাতে পেয়ে গেছে তেহরান।
পারমাণবিক আলোচনার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ খুলে দিতে
শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে খসড়া চুক্তি সই হওয়ার কথা। কিন্তু তার আগেই ইরান প্রমাণ
করে দিয়েছে, যুদ্ধ চলাকালীন তারা অনায়াসে এই প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। মার্কিন
গোয়েন্দারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতেও এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন সম্পর্কে অবগত এক সূত্র সিএনএনকে বলেন, ‘আমরা এখন কার্যত
ইরানের হাতেই এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছি—এ হাতিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের
চেয়েও শক্তিশালী।’ এ যুদ্ধ ভবিষ্যতের কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়ে তেহরানের চিন্তাভাবনায়
আমূল পরিবর্তন এনেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গোয়েন্দা মূল্যায়নের বিষয়ে ওয়াকিবহাল দ্বিতীয় এক সূত্র জানায়, উপসাগরীয় দেশগুলোর
জ্বালানি অবকাঠামোতে সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়ে ইরান নিজেদের আরেকটি ‘অসম সক্ষমতার’
শক্তির প্রমাণ পেয়েছে। যুদ্ধের সময় এই কৌশল প্রয়োগ করে তারা অভাবনীয় সফলতা পেয়েছে।
ভবিষ্যতে একে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর আরেকটি বড় হাতিয়ার হিসেবে দেখছে ইরান।
হরমুজ পুরোপুরি খুলে দিতে ইরানের ব্যাপক আলোচনা চালাতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। এটাই
প্রমাণ করে এ অঞ্চলে ইরানিদের প্রভাব কতটা প্রবল। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন
ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালকের কার্যালয়ের কাছে মন্তব্য জানতে চেয়েছিল সিএনএন।
একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, হরমুজ খোলা না রাখলে ও অন্যান্য
শর্ত মেনে না চললে খসড়া চুক্তির ‘কোনো সুবিধাই’ ইরান পাবে না। সুবিধাগুলোর
বিস্তারিত না জানালেও তিনি বলেন, ইরান হরমুজে জাহাজ চলাচল যতটা স্বাভাবিক করবে,
যুক্তরাষ্ট্রও ঠিক সেই অনুপাতে অবরোধ শিথিল করবে।
খসড়া চুক্তি সম্পর্কে অবগত আরেক সূত্র সিএনএনকে নিশ্চিত করেছে, হরমুজে জ্বালানির
অবাধ প্রবাহ ব্যাহত করার চেষ্টা করেছিল ইরান। কিন্তু তাদের এই পদক্ষেপে চীনসহ
উপসাগরীয় দেশগুলো ক্ষুব্ধ হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তির শর্ত নিয়ে ধোঁয়াশা ও অন্যান্য ঝুঁকির কারণে এই
গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক
মাসও লেগে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালীকে ভবিষ্যতেও ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারবে—ইরানের এই বিশ্বাসের মূল
কারণ দেশটির বিশাল অস্ত্রভান্ডার এখনো প্রায় অক্ষত। তাদের মিসাইল, ড্রোন, মিসাইল
লাঞ্চার ও শত শত ছোট ফাস্টবোট এখনো হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে তাড়া করছে। এই
নৌযানগুলো দিয়ে সমুদ্রে মাইন পাতা যায়। এছাড়া ওয়াশিংটনের ধারণার চেয়েও দ্রুত গতিতে
ঘুরে দাঁড়িয়েছে ইরানের সামরিক শিল্প খাত। ইতোমধ্যেই নতুন ড্রোন তৈরিও শুরু করেছে
তেহরান।
হরমুজ উন্মুক্ত হওয়ার পর মিত্রবাহিনী কোনোভাবে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল দেবে
কিনা, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এ ব্যবস্থা ঠিক কীভাবে কাজ করবে, তা এখনো অস্পষ্ট।
আপাতদৃষ্টিতে দুই পক্ষ প্রণালীটি খুলে দেওয়া ও চলমান সংঘাত থামানোর লক্ষ্যে
চুক্তিতে সই করলেও পর্দার আড়ালে পরিস্থিতি ভিন্ন। একাধিক সূত্রমতে, যুক্তরাষ্ট্রের
সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে গেলে ইরান একটি অর্থনৈতিক ‘পারমাণবিক অস্ত্র’ প্রয়োগের
পরিকল্পনা করেছে। সেটি হলো—ইয়েমেনে ইরানের প্রধান মিত্র হুথিদের দিয়ে
বাব-এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরকে যুক্ত করা এই
প্রণালি বিশ্ববাণিজ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ধমনি। ইরান হরমুজ কার্যত বন্ধ করে রাখায়
গত কয়েক মাস ধরে বাব-এল-মান্দেবই ছিল আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের মূল লাইফলাইন।
মার্কিন গোয়েন্দাদের এই সামগ্রিক মূল্যায়ন আরেকটি বিষয় সামনে এনেছে। ইরানের হরমুজ
বন্ধ করে দেওয়ার জেদকে পাত্তা না দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে
যুদ্ধ শুরু করেছেন, এটি তারই দীর্ঘমেয়াদি কুফল। একইসাথে এই ঘটনা বিশ্ব অর্থনীতিকে
হাতিরা করতে তেহরানের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—যে সংকটের
সমাধান দুই দেশের মধ্যকার সাময়িক খসড়া চুক্তি দিয়ে সম্ভব নয়।
ইরান প্রণালীটি বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো
নিয়মিত বিরতিতে একটি বিষয় খতিয়ে দেখছে—ভবিষ্যতে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে
তেহরান এই একই হাইয়ার ব্যবহার করতে পারে।
গোয়েন্দা মহলে এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত ঐকমত্য না এলেও, মার্কিন মূল্যায়ন সম্পর্কে অবগত
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইরানের আত্মবিশ্বাস এখন অনেক বেশি। কারণ, নিজেদের সক্ষমতা
তেমন না বাড়িয়েই তারা অনায়াসে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি উপসাগরীয়
দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে সফলভাবে আঘাত হানতে পেরেছে।
এখন যেহেতু ইরান প্রমাণ করেছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার মতো ইচ্ছা ও ক্ষমতা—দুটোই
তাদের আছে, তাই মার্কিন প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাই মনে করছেন, ভবিষ্যতে তারা আবারও
এই একই পদক্ষেপ নেবে।
সোমবার মার্কিন প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য ‘এমন
একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে এই প্রণালি বন্ধ করার কোনো সুযোগই আর না
থাকে।’
তবে ইরান চুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে তেহরানকে কীভাবে হরমুজ বন্ধ করা থেকে বিরত রাখা
যাবে, সে বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রায় নীরবই থেকেছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র
যখন নৌঅবরোধ তুলে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায়
ফিরিয়ে নেবে, তখন ইরানকে কীভাবে ঠেকানো হবে, সে ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট জবাব মেলেনি।





