হলিউডের শহর লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামের মঞ্চটি যেন গতকাল রূপ নিয়েছিল
বাস্তব জীবনের কোনো এক আবেগঘন সিনেমার চিত্রনাট্যে। ঘড়ির কাঁটায় তখন চলছে ফিফা
বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর প্রথম ম্যাচের ইনজুরি টাইমের অন্তিম মুহূর্ত,
স্কোরবোর্ড বলছে ০-০ ড্র। ঠিক এমন এক স্নায়ুচাপের মুহূর্তে দক্ষিণ আফ্রিকার
ডি-বক্সের বাইরে থেকে এক অবিশ্বাস্য ও চোখ ধাঁধানো হাফ ভলিতে বল জালে জড়ান কানাডার
মিডফিল্ডার স্টিফেন ইউস্তাকিও। দক্ষিণ আফ্রিকার বাজপাখি খ্যাত গোলরক্ষক রনওয়েন
উইলিয়ামসকে পরাস্ত করা এই এক গোলেই ইতিহাস গড়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো
শেষ ষোলো বা নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করে টুর্নামেন্টের সহ-আয়োজক কানাডা। ২৯ বছর
বয়সী এই মিডফিল্ডারের ক্যারিয়ারে এটিই সম্ভবত এখন পর্যন্ত সবচেয়ে মূল্যবান এবং
স্মরণীয় গোল।
বিশ্বকাপের মঞ্চে কানাডাকে অবিস্মরণীয় এক ইতিহাস গড়ে দেওয়া এই মহানায়ককে শুধু একজন
সাধারণ ফুটবলার বললে ভুল হবে; স্টিফেন ইউস্তাকিও হলেন জীবনের চরম ট্র্যাজেডি ও
শোককে জয় করা এক লড়াকু সৈনিক। লস অ্যাঞ্জেলেসের সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে যখন তিনি
গোলটি করছিলেন, তখন তাঁর হৃদয়ের কোণায় জমা ছিল পিঠাপিঠি বাবা-মাকে হারানোর তীব্র এক
বেদনা। ২০২৩ সালের এপ্রিলে ক্লাব পোর্তোর হয়ে ম্যাচ চলাকালীন সময়েই ইউস্তাকিওর মা
এসমেরালদা ব্রেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর ঠিক এক বছর পর, হঠাৎ হার্ট
অ্যাটাকে মারা যান তাঁর বাবাও। জীবনের এত বড় দুটি ধাক্কা ও গভীর শোক বুকে চেপেও
ভেঙে পড়েননি ইউস্তাকিও, বরং সেই কান্নাকে বানিয়েছেন নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি। অবশ্য
এই বেদনার মাঝেই তাঁর ও তাঁর প্রেমিকা কনস্টান্টার কোল আলো করে আসে এক
কন্যাসন্তান—বেনেদিতা।
ম্যাচ শেষের আবেগঘন সাক্ষাৎকারে নিজের চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে ইউস্তাকিও বলেন,
“আমি মাঠে যা কিছু করি, সবকিছু আমার পরিবারের জন্য; আমার প্রয়াত বাবা-মা, আমার
প্রেমিকা, আমার মেয়ে, আমার ভাই এবং দেশের বন্ধুদের জন্য—এই সবার জন্য।” এর আগে ২০২৪
সালের সেপ্টেম্বরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউস্তাকিওর বড় ভাই তথা ইন্টার টরন্টো এফসির
প্রধান কোচ মাউরো ইউস্তাকিও বলেছিলেন, তাঁরা দুই ভাই এই গভীর শোককে শক্তিতে
রূপান্তর করার এবং বাবা-মায়ের জীবনকে সম্মানিত করার এক সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মাউরো আবেগের সঙ্গে বলেছিলেন, “আমাদের বাবা-মা আমাদের উড়ার জন্য ডানা দিয়েছিলেন।
তাই এখন উড্ডয়নের দায়িত্বটা আমাদের নিজেদেরই।”
পর্তুগিজ কমিউনিটির ওন্টারিওর লিমিংটনে শৈশবে ফুটবল খেলা শুরু করা ইউস্তাকিও
আন্তর্জাতিক ফুটবলের বয়সভিত্তিক পর্যায়ে কানাডার হয়ে যাত্রা শুরু করলেও, মাঝখানে
পর্তুগালের অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়েও কিছু ম্যাচ খেলেছিলেন। তবে ২০১৯ সালের
ফেব্রুয়ারিতে তিনি পাকাপাকিভাবে কানাডার সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে খেলার চূড়ান্ত
সিদ্ধান্ত নেন এবং ২০২১ সালের গোল্ড কাপ, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ও ২০২৫ ফিফা
ক্লাব বিশ্বকাপেও মাঠ মাতান। রবিবারের এই ঐতিহাসিক ম্যাচে নিয়মিত অধিনায়ক আলফোনসো
ডেভিস ইনজুরির কারণে শুরুর একাদশে না থাকায় দলের অন্তর্বর্তীকালীন অধিনায়কের
গুরুদায়িত্ব ছিল ইউস্তাকিওর কাঁধে। সহ-আয়োজক কানাডার হয়ে নিজের ৬১তম ম্যাচে এসে
ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ও সবচেয়ে মহামূল্যবান গোলটি করলেন এই লড়াকু মিডফিল্ডার।
নিজের সেই ঐতিহাসিক জয়সূচক গোলটি নিয়ে ইউস্তাকিও আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, “গোলটা সত্যিই
অসাধারণ ছিল। তবে সত্যি বলতে, আমি যখন শটটা নিচ্ছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল পুরো
দেশবাসী আমার সঙ্গে শটটা নিয়েছে। সবাই যেন সেই শটে অল্প অল্প করে শক্তি জুগিয়েছে,
আর বলটা গিয়ে আছড়ে পড়েছে জালের ভেতরে!” দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিদায় করে এবার শেষ ষোলোর
মহালড়াইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে কানাডা। আগামীকাল নেদারল্যান্ডস বনাম মরক্কো ম্যাচের জয়ী
দলের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটার মহাগুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে
তারা।





