মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির দখলে থাকা এলাকা
পুনর্দখলের লক্ষ্যে বিমান হামলা চালিয়েছে দেশটির জান্তা বাহিনী। বৃহস্পতিবার (২
জুলাই) সকাল ৮টার দিকে রাখাইনের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপজুড়ে একের পর এক যুদ্ধবিমানের
হামলায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশ সীমান্তের টেকনাফের বিস্তীর্ণ
এলাকা।সেই উত্তেজনার আঁচ লেগেছে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায়ও।
এতে সীমান্ত এলাকার বাংলাদেশিরা রয়েছে চরম আতঙ্কে। এই পরিস্থিতিতে কক্সবাজারজুড়ে ১২
লাখ রোহিঙ্গা বসতি ক্যাম্পগুলোর পরিস্থিতিও থমথমে। এমন পরিস্থিতিতে আবারও রোহিঙ্গা
অনুপ্রবেশের শঙ্কা থেকে টেকনাফ সীমান্তে স্থল-নাফনদীতে টহল জোরদার করেছে বিজিবি।
সংঘর্ষের কারণে আবারও অনুপ্রবেশের শঙ্কা দেখা দিয়েছে সীমান্ত এলাকায়। যদিও
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, মিয়ানমার থেকে আর কাউকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না।
এমনিতেই প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়েছে। এবার মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা বা
যে-ই আসুক, কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। সব মিলিয়ে মিয়ানমারের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে
বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে অজানা শঙ্কা বিরাজ করছে।
ক্যাম্পের পরিস্থিতি কেমন, জানতে চাইলে রোহিঙ্গা নেতা ছৈয়দ আলম বলেন , বাংলাদেশে
এখানে কোনও ঝামেলা নেই। কিন্তু আমরা তো ওপারেরই মানুষ। ওখানে লড়াই চললে সেই আঁচ
আমাদের মধ্যে লাগে। আমাদের প্রতি আচরণ কেমন হবে, ওখানে কী পরিস্থিতি হচ্ছে, এসব
নিয়ে আমাদের মধ্যে অস্থিরতা আছে। কারণ এখন জান্তা সরকার নতুন করে রোহিঙ্গা গ্রাম
গুলোতে বিমান হামলা চালাচ্ছে।
সীমান্তের বাসিন্দারা বলছেন, টেকনাফ সীমান্তের জাদিমুড়া থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত
বিস্ফোরণের শব্দ স্পষ্টভাবে শোনা যায়। মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে সীমান্তসংলগ্ন জনপদের
বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে বুধবার রাত ৯টা ৩৭ মিনিট থেকে ৯টা ৪২
মিনিটের মধ্যে চার দফা ভারী মর্টার শেল বিস্ফোরণের শব্দেও প্রকম্পিত হয় পুরো
সীমান্ত এলাকা। প্রতিবারের মতো এবারও ওপারের যুদ্ধের প্রভাব এসে পড়েছে এপারের
মানুষের জীবনে। সীমান্তের বাসিন্দারা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। একই
সঙ্গে কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের মাঝেও নতুন করে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা
দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের বিস্ফোরণ সীমান্ত পেরিয়ে শুধু শব্দই নয়, সঙ্গে নিয়ে এসেছে ভয়,
উদ্বেগ ও হতাশার দীর্ঘ ছায়া।
মিয়ানমারের মংডু উপজেলার খাওয়ার বিলের বাসিন্দা মোহাম্মদ আনোয়ার প্রাণ বাঁচাতে
২০১৭ সালে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নেন।
তবে তার অনেক স্বজন এখনো মিয়ানমারেই বসবাস করছেন। দেশটিতে চলমান সংঘাতের খোঁজখবর
তিনি নিয়মিত মুঠোফোনে স্বজনদের কাছ থেকে নেন।
স্বজনদের বরাতে মুহাম্মদ আনোয়ার বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকালেও মংডু এলাকায় গোলার বিকট
শব্দ শোনা গেছে। মূলত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা মংডু ও বুথিডংয়ে তাদের সদর
দপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এসব হামলার প্রভাব আশপাশের কয়েকটি রোহিঙ্গা
গ্রামেও পড়েছে। এতে অন্তত দুইজন রোহিঙ্গা হতাহত হওয়ার খবর পেয়েছি। এছাড়া ২০ থেকে
৩০টি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মংডু এলাকায় এখনো হাজারো রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। তারা চরম আতঙ্কের
মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
শুধু আমার স্বজনই নন, উখিয়ার ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া অনেক রোহিঙ্গার আত্মীয়স্বজনও
এখনো সেখানে আছেন। চলমান যুদ্ধের কারণে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা সবসময় উদ্বিগ্ন।
কখন কী ঘটে, তা বলা খুবই কঠিন। কেননা গত দুই দিনে ৩০টির মতো বিমান হামলার ঘটনা
ঘটেছে। ’
এদিকে র্দীঘদিন বন্ধ থাকার পর গত দুই দিন ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের
মংডু-বুথেডং শহরতলিতে রাতে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে
দেশটির সরকারি বাহিনী। এতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণে শব্দে কাঁপছে টেকনাফ সীমান্তের
লোকজনের ঘরবাড়ি। আতঙ্কে অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের কথা ভাবছেন।
এ বিষয়ে টেকনাফ শাহপরীরদ্বীপের নাফ নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. নুরুল আবসার
বলেন, ‘হঠাৎ ভয়াবহ ঝাঁকুনি অনুভব করি। মনে হচ্ছিল, যেন পুরো পৃথিবী কেঁপে উঠছে।
পরপর চারটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি। প্রথম বিস্ফোরণের সময় নাফ নদীর ওপারে
আগুনের লেলিহান শিখাও দেখা গেছে। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, আগুনের ঝলক আমাদের
দিকেই এগিয়ে আসছে। বিস্ফোরণটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ধারণা করা
হচ্ছে, আরাকান আর্মির ছোড়া মর্টার শেলের বিস্ফোরণ হতে পারে।’
প্রসঙ্গত, সর্বশেষ ২৮ ডিসেম্বরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও জান্তা
সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে মর্টার শেল ও মুহুর্মুহু গুলির শব্দে
কাঁপছিল উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত। র্দীঘদিন বন্ধ থাকার পর আরাকান আর্মি দখলে থাকা
রাখাইন রাজ্যে পূর্ন উদ্ধারে আবার হামলা শুরু করেছে মিয়ানমার সরকার।
এদিকে মিয়ানমারের সংঘাতের জের ধরে নতুন করে টেকনাফ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে
জল-স্থলপথে টহল জোরদার করেছে বিজিবি। এর অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার বিকেলে টেকনাফ ২
বিবিজির লেফটেন্যান্ট ফুয়াদ রহমানের নেতৃত্বে পৌরসভার নাইট্যংপাড়া, বরইতলী ও
জাদিমোড়া সীমান্ত এলাকায় জল-স্থলপথে নৌ টহল এবং ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করতে দেখা
যায়। এছাড়া টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ এবং হ্নীলা পর্যন্ত সীমান্তে টহল জোরদার করা
হয়েছে, যাতে নতুন করে কোনো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বা চোরাচালানের ঘটনা না ঘটে।
এ বিষয়ে বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন,
‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলা বা সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেই এর প্রভাব
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে পড়ে। বিস্ফোরণের শব্দে সীমান্তের বাসিন্দাদের
মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতিতে অনেক রোহিঙ্গা নাফ নদী পেরিয়ে
বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, ‘সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সীমান্তজুড়ে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি
প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে।’
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নিধনযজ্ঞ থেকে বাঁচতে দশ লাখের বেশি
রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে তারা উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন
ক্যাম্পে রয়েছেন। বৈশ্বিকভাবে আলোচনার পরও তাদের ফেরানোর কোনও উদ্যোগ এখনো সফল
হয়নি। এবারের সংঘর্ষ থেকে বাঁচতে নতুন করে আবার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা করছেন
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।





