, ,

ভুল গোয়েন্দা তথ্যের শিকার ১৬৮ ইরানি শিশু

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মিনাবের শাজারেহ তাইয়িবা স্কুলে বিমান হামলা চালায়

মার্কিন বাহিনী। সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক ইতিহাসে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক

হতাহতের ঘটনাগুলোর একটি। এই হামলায় ১৬৮ ইরানি শিশু মারা যায় যার নেপথ্যে ছিল ভুল

গোয়েন্দা তথ্য।

মার্কিন সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্র সিএনএনকে

জানিয়েছে, ইরানে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য গুরুতরভাবে পুরোনো

হয়ে গেছে বলে সতর্কবার্তা ছিল। কিন্তু এ তথ্য পেন্টাগনের ডেটাবেসে থাকা সত্ত্বেও

মার্কিন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডাররা তা উপেক্ষা করে কয়েকটি হামলার অনুমোদন দেন। এর

মধ্যে একটি হামলায় একটি স্কুলে আঘাত হানে, যাতে প্রায় ২০০ শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক

নিহত হন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবের শাজারেহ

তাইয়িবা স্কুলে ওই হামলায় অন্তত ১৬৮ শিশু ও ১৪ জন শিক্ষক নিহত হন। হামলার আগে

কীভাবে মার্কিন কর্মকর্তারা গোয়েন্দা তথ্য উপেক্ষা করেছিলেন, তা নিয়ে একটি

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম সিএনএন।

সূত্রগুলো জানায়, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ব্যবহৃত ডেটাবেসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল

যে গোয়েন্দা তথ্য বহু বছর আগের এবং তা পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো স্থানকে

হামলার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার অনুমোদনও প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু দুটি সূত্রের ভাষ্য, যুদ্ধের শুরুতে দ্রুত লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রস্তুত

করার তাগিদে জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা ‘দ্রুততার স্বার্থে’ সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষার

সিদ্ধান্ত নেন। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তই স্কুলটিতে সরাসরি হামলার কারণ হয়।

২০১৩ সালের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, স্কুলটি এবং পাশের আইআরজিসি ঘাঁটি একসময়

একই কমপাউন্ডের অংশ ছিল। তবে ২০১৬ সালের ছবিতে দেখা যায়, স্কুলটিকে ঘাঁটির বাকি

অংশ থেকে আলাদা করতে একটি বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে এবং স্কুলের জন্য পৃথক

প্রবেশপথও তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের স্যাটেলাইট চিত্রে স্কুলের আঙিনায়

কয়েক ডজন মানুষকে খেলাধুলা করতেও দেখা যায়।

একটি সূত্র জানায়, একজন বিশ্লেষক আগেই একটি গোয়েন্দা বিশ্লেষণ টুলে ওই স্থানের

পরিবর্তনের বিষয়টি নথিভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু সেই টুলের সঙ্গে সামরিক লক্ষ্যবস্তু

নির্ধারণের ডেটাবেসের কোনো সংযোগ ছিল না। ফলে সেই সতর্কবার্তা কখনোই কমান্ডারদের

কাছে পৌঁছায়নি।

একটি সূত্র বলেছে, ‘স্কুলে হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা

বোঝে গিয়েছিলেন ভুলটি কীভাবে ঘটেছে। স্পষ্টতই এটি ছিল পুরোনো তথ্যের ফল।’

সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা হাজারো লক্ষ্যবস্তুর তথ্য

হালনাগাদ করতে তড়িঘড়ি শুরু করেন। তবে হামলা শুরুর আগে সব তথ্য হালনাগাদ করা সম্ভব

হয়নি। ফলে অনেক লক্ষ্যবস্তুর তথ্য ১০ বছরেরও বেশি পুরোনো ছিল।

দুটি সূত্র জানায়, বিশ্লেষকরা প্রথমে ‘উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত’ লক্ষ্যবস্তুর তথ্য

হালনাগাদে মনোযোগ দেন। এর মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও বিমানের মতো চলমান

লক্ষ্যবস্তু, যেগুলো মার্কিন বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতো।

স্কুলে পরিণত হওয়া সামরিক স্থাপনার মতো স্থায়ী লক্ষ্যবস্তুগুলো সাধারণত নিম্ন

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ছিল। কারণ এগুলো স্থান পরিবর্তন করে না। ফলে এসব স্থাপনার তথ্য

অনেক ক্ষেত্রেই হালনাগাদ হয়নি।

দুটি সূত্র জানায়, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ব্যবহৃত ‘মডার্নাইজড ইন্টিগ্রেটেড

ডেটাবেস’ বা এমআইডিবি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘মার্স’-এ

স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে ইরানসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারের আগে অবশ্যই হালনাগাদ করতে

হবে। তবে নতুন প্ল্যাটফর্ম মাসে রূপান্তরের কাজ নির্ধারিত সময়সূচির তুলনায় কয়েক

বছর পিছিয়ে রয়েছে এবং এখনো এমআইডিবিই প্রধান তথ্যভাণ্ডার।

সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্র জানায়, পরিস্থিতি আরও জটিল

হয়েছিল, কারণ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দায়িত্ব নেওয়ার পর বেসামরিক হতাহত

কমানোর কর্মসূচিতে বড় কাটছাঁট করেন। সামরিক কমান্ডগুলোতে এই কর্মসূচির জনবল ৯০

শতাংশেরও বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়। সেন্ট্রাল কমান্ডের ১০ সদস্যের দলকে কমিয়ে মাত্র

একজন পূর্ণকালীন কর্মীতে নামিয়ে আনা হয় এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণকারী

হামলা-পরিকল্পনা দল থেকে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি বিশেষজ্ঞদেরও সরিয়ে দেওয়া হয়।

একটি সূত্র বলেছে, ‘সেন্টকমের দল তখনো সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিল। কিন্তু হেগসেথের

সিদ্ধান্তের কারণে তাদের প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদ ছিল না।’ আরেকটি সূত্র বলেছে,

‘পেন্টাগন সবাইকে আরও দ্রুত কাজ করতে চাপ দিচ্ছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায়

সাবেক হেজ ফান্ড কর্মকর্তা ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্বদেরও প্রভাব ছিল। তবে সেন্টকমের

নেতৃত্বও এর বিরোধিতা করেনি।’

হামলার পরপরই ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এর জন্য ইরান দায়ী হতে পারে। পরে তিনি

বলেন, ‘এ ঘটনার দায় কার তা হয়তো কখনোই নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না।’

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বলেন, ‘এ হামলার ‘‘পূর্ণাঙ্গ’’ তদন্ত করা হবে এবং

যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক হতাহত এড়াতে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করেছে।’ হেগসেথের

বেসামরিক হতাহত কমানোর কর্মসূচিতে আনা পরিবর্তন নিয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দপ্তর কোনো জবাব দেয়নি।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘এই তদন্ত এখনো চলছে। যুক্তরাষ্ট্র

কখনোই বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানায় না।’ লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ প্রক্রিয়া

সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব দিতে পেন্টাগন বিষয়টি সেন্টকমের কাছে পাঠায়। তবে চলমান

তদন্তের কথা উল্লেখ করে সেন্টকম মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কয়েক মাস পেরিয়ে

গেলেও পেন্টাগন এখনো এ ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।

পোস্টটি শেয়ার করুন