, ,

সীমান্তে ফের পুশইনের চেষ্টা রুখে দিল বিজিবি ও জনতা

দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তজুড়ে আবার অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে ভারতীয়

সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। পঞ্চগড়, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, জয়পুরহাট এবং শেরপুর

সীমান্ত দিয়ে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীসহ বহু মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে

দেওয়ার (পুশইন) মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে তারা। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি)

অতন্দ্র প্রহরা এবং সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের সাহসী প্রতিরোধের মুখে বিএসএফের এই

অবৈধ চক্রান্ত ভেস্তে গেছে। অনেক জায়গাতেই পুশইনের শিকার ব্যক্তিরা এখন জিরো

পয়েন্টে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

পঞ্চগড় সীমান্ত: তেঁতুলিয়া সীমান্ত দিয়ে শনিবার (১১ জুলাই) নারী ও শিশুসহ ১৩ জনকে

পুশইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। তবে বিজিবির তাৎক্ষণিক তৎপরতায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ

হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আবার ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

বিজিবি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মাঝিপাড়া সীমান্তের বিপরীতে ভারতের নয়াবাড়ি

বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা ভোরে নারী, শিশুসহ মোট ১৩ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর

চেষ্টা করে। বিষয়টি নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিজিবির টহলদল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুশইনের

প্রচেষ্টা প্রতিহত করে। পরে বিজিবির কঠোর অবস্থানের মুখে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের

পুনরায় ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়।

পঞ্চগড়-১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ মোহাম্মদ

কায়েস জানান, যাদের পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছিল তারা সবাই ভারতের অভ্যন্তরে

অবস্থান করছিলেন। বিজিবির সদস্যরা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় পুশইনের চেষ্টা সফল

হয়নি এবং বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

জয়পুরহাট সীমান্ত: সদর উপজেলার পশ্চিম রামকৃষ্ণপুর সীমান্তে ভোর সাড়ে ৩টার দিকে

সীমান্তের সব আলো নিভিয়ে দিয়ে ৫ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ।

স্থানীয়রা টের পেয়ে বিজিবিকে জানালে বিজিবি দ্রুত গিয়ে বাধা দেয়। এ সময় ২ জন পালিয়ে

গেলেও দুই নারী ও এক পুরুষ বর্তমানে শূন্যরেখায় আটকা পড়ে আছেন।

দিনাজপুরে আটক বাংলাদেশিদেরই ফেরত পাঠানোর অপচেষ্টা: দিনাজপুরের দাইনুর সীমান্তে

বিএসএফের পুশইনের শিকার ৪ জন আসলে ভারতীয় নাগরিক নন, তারা বাংলাদেশি। প্রায় দুই বছর

আগে কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়ে তারা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন এবং দুই মাস কারাভোগ

করেন। কারামুক্তির পর আইনি প্রক্রিয়ায় পুশব্যাক না করে, বিএসএফ গভীর রাতে চোরের মতো

তাদের ৩১৫ নম্বর মেইন পিলারের কাছ দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করে। এদের মধ্যে এক নারী ও

এক প্রতিবন্ধী পুরুষও রয়েছেন। বিজিবির ফুলবাড়ী ২৯ ব্যাটালিয়নের বাধার মুখে তারা এখন

শূন্যরেখায় দিন কাটাচ্ছেন। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিজিবি পতাকা বৈঠকের চিঠি দিলেও

বিএসএফ এখনো কোনো জবাব দেয়নি।

লালমনিরহাটে বিজিবি-জনতার যৌথ প্রতিরোধ: লালমনিরহাটের পাটগ্রামের ধবলসূতি ও

ষোলঘরিয়া সীমান্তে ভারতের ৯৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের খরখরিয়া ক্যাম্পের সদস্যরা ৩ জন

ভারতীয় নারীকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে এবার শুধু বিজিবি

নয়, স্থানীয় উৎসুক জনতাও লাঠিসোঁটা নিয়ে সীমান্তে জড়ো হয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান।

বিজিবি ও সাধারণ মানুষের এই যৌথ প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ পিছু হটে এবং ওই নারীদের

ভারতের ১৫০ গজ অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

শেরপুর সীমান্তে ছড়াচ্ছে আতঙ্ক: রাতভর গ্রামবাসীর পাহারা: সবচেয়ে উদ্বেগজনক

পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গোমরা গ্রাম সীমান্তে। গত

বৃহস্পতিবার ৪ জনকে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর স্থানীয়দের কাছে খবর আসে—ওপারে

মেঘালয় রাজ্যের ভেতর প্রায় দুই শতাধিক মানুষকে জড়ো করে রেখেছে বিএসএফ, যাদের যেকোনো

মুহূর্তে বাংলাদেশে পুশইন করা হতে পারে।এই আতঙ্কে গোমরা গ্রামের সাধারণ মানুষ ১৫

থেকে ২০ জনের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে, লাঠিসোটা ও টর্চলাইট নিয়ে রাতভর ভারতের জিরো

পয়েন্টের কাছাকাছি সবজি ক্ষেতগুলোতে পাহারা দিচ্ছেন। দেশের সীমান্ত রক্ষায় সাধারণ

মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্ত এলাকায় নতুন করে অস্থিতিশীলতা

তৈরি করতেই বিএসএফ সুপরিকল্পিতভাবে এই পুশইনের ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে।

এ বিষয়ে তিস্তা ৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফজলে

মুনিম এবং ময়মনসিংহের ৩৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নুরুল আজিম

বায়েজীদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও অস্ত্র পাচার

রোধ করা বিজিবির নিয়মিত দায়িত্ব। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পুশইন ঠেকাতে বিজিবি

দিনরাত ‘হাই ভলিউম’ নজরদারি ও টহল জোরদার করেছে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায়

রাখা হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন দৈনিক বাংলার ঞ্চগড়, দিনাজপুর,

লালমনিরহাট, জয়পুরহাট এবং শেরপুর প্রতিনিধি।

পোস্টটি শেয়ার করুন