দেশের সাতটি জেলায় প্রবল বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে জনজীবন চরম বিপর্যয়ের মুখে
পড়েছে। বন্যার ভয়াবহতায় এ পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৫১ জনে দাঁড়িয়েছে এবং
পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও
ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ৫৯টি
উপজেলা বর্তমানে প্লাবিত। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার
ছাড়িয়েছে। প্রাণ হারানোদের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৮ জন কক্সবাজারের বাসিন্দা। এছাড়া
চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু
হয়েছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের
বিস্তীর্ণ জনপদ বর্তমানে কার্যত বিচ্ছিন্ন। বসতঘর ও গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে
থাকায় নৌকাই এখন চলাচলের একমাত্র মাধ্যম। বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা
শেলী আক্তারের ঘরের মেঝেতে এখনও পানি বইছে। চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটানো এই নারী
আক্ষেপ করে বলেন, ‘চোখত ঘুম নাই, পেডত ভাত নাই। বইন্যার পানি হত্তে নামিব, ন জানি।
এরহম দুর্দশাত ক্যানে পইড়লাম। আরেক্কান ঘর তুলিবার টিঁয়াও নাই।’ তাঁর মতো লাখো
মানুষের ঘরে উনুন জ্বলছে না এবং বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ
নলকূপ তলিয়ে থাকায় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
এদিকে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জেও বন্যা পরিস্থিতি অবনতির দিকে। হবিগঞ্জে
প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। জেলার নিচু
এলাকাগুলোতে এখনও দুই থেকে আড়াই ফুট পানি স্থির হয়ে আছে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার
বনগাঁও গ্রামের সিরাজ মিয়া তাঁর দুরাবস্থা বর্ণনা করে বলেন, ‘ঘরে পানি। গরু-ছাগল
নিরাপদ জায়গায় রাখতে হয়েছে। কৃষিজমির সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই পানি
না নামলে আরও বড় ক্ষতি হবে।’ সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনাতেও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায়
স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কুড়িগ্রামে নদ-নদীর তীব্র ভাঙনে ঘরবাড়ি
হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত
হয়েছে এবং আগামী কয়েকদিনও এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ
কেন্দ্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামের পরিস্থিতি আগামী এক দিনের মধ্যে কিছুটা উন্নত হতে
পারে, তবে সিলেট অঞ্চলের উন্নতি নির্ভর করছে বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর। তিন
পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে পানি নামতে শুরু করলেও সেখানে
অবকাঠামো ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দৃশ্যমান হচ্ছে। জুম খেত ও আমন-আউশের বীজতলা
নষ্ট হওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। যাতায়াত ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার চেষ্টা
চললেও অনেক এলাকার সড়ক ও সেতু ধসে পড়ায় যোগাযোগ পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়েছে।





