আষাঢ়ের চেনা বৃষ্টি মানেই এখন বাংলাদেশের দুই প্রধান মেগাসিটির বুকে এক অচেনা
আতঙ্ক। আকাশে কালো মেঘের গুড়গুড় ডাক শুনলেই বুক কাঁপে কোটি নগরবাসীর। আধা ঘণ্টার
এক পশলা বৃষ্টিতেই ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম—সবখানে তৈরি হয় রূপক অর্থে ‘নগর-নদী’।
অলিতে-গলিতে জমে হাঁটু থেকে কোমর জল, কোথাও কোথাও তা বুক সমান উচ্চতাও ছাড়িয়ে যায়।
নোংরা, দূষিত পানিতে নাকাল হতে হয় সাধারণ মানুষকে। বছরের পর বছর গেছে, দশক পার
হয়েছে; নতুন নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সিটি মেয়ররা এসেছেন দৃশ্যপটে। প্রতিবারই
নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ইশতেহারে বড় বড় হরফে লেখা হয়েছে জলাবদ্ধতা মুক্তির
স্বপ্ন। ড্রেন চওড়া করা, খাল উদ্ধার, কালভার্ট পরিষ্কারের হিড়িক পড়েছে, খরচ হয়েছে
হাজার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। লস অ্যাঞ্জেলেস, টোকিও কিংবা
সিঙ্গাপুরের মতো আধুনিক মেগাসিটি হওয়ার স্বপ্ন দেখা রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক নগরী
চট্টগ্রাম প্রতি বর্ষায় এসে থমকে যায় আদিম এক জলজটের বৃত্তে। যেন প্রতিবারই মৌসুমি
বৃষ্টিতে জলে ভাসে আধুনিকতার দাবিদার দুই শহর, আর নর্দমার নোংরা পানিতে তলিয়ে যায়
জনপ্রতিনিধিদের রঙ-বেরঙের প্রতিশ্রুতি।
তবে এবারের সংকট শুধু দুই প্রধান শহরের জলাবদ্ধতার ভোগান্তিতেই সীমাবদ্ধ নেই; তা
রূপ নিয়েছে এক জাতীয় সংকটে। টানা ভারি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে দেশের
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় বন্যা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার
নিয়েছে। এ পর্যন্ত বন্যা ও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছে
আরো ৩৯ জন।
একদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে গিয়ে পরিণত হয়েছে অচল
নগরীতে; অন্যদিকে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের গ্রামীণ ও মফস্বল জনপদে বন্যা
পরিস্থিতি ধারণ করেছে এক ভয়াবহ ও মানবিক বিপর্যয়কর রূপ। প্রকৃতির এই চরম বৈরী আচরণ
এবং মানুষের তৈরি কাঠামোগত ব্যর্থতার মুখে পড়ে বর্তমানে থমকে গেছে দেশের কোটি
মানুষের স্বাভাবিক জনজীবন।
ডুবন্ত ঢাকা, নাকাল নগরবাসী: শনিবার রাত থেকে শুরু হওয়া অবিরাম বৃষ্টিতে রাজধানী
ঢাকার আধুনিক ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটি আবারও উন্মোচিত
হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত ১২টা থেকে রোববার সকাল ৬টা
পর্যন্ত ৭৬ মিলিমিটার এবং সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাত্র ছয় ঘণ্টায় ঢাকায়
৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর আগের ২৪ ঘণ্টায়ও বৃষ্টি হয়েছে ৯৮
মিলিমিটার।
স্বল্প সময়ে এই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি সামাল দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে নগরীর
পানি নিষ্কাশন নালাগুলো। ফলে ভোর হতেই গ্রিন রোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি, কারওয়ান
বাজার, বিজয় সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও
মনিপুর এলাকা কার্যত পানির নিচে তলিয়ে যায়। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে আবাসিক
এলাকার অলিগলিতে এখন হাঁটুর ওপর পানি।
ফুটপাত তলিয়ে যাওয়ায় পথচারীরা মূল সড়ক দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন।
নোংরা পানির ঢেউয়ে ভিজে একাকার হচ্ছেন অফিসগামী মানুষ। সড়কগুলোতে শত শত রিকশা,
অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে থাকায় সৃষ্টি হয়েছে মাইলের পর মাইল
তীব্র যানজট। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক
জলাবদ্ধতা।
জলাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় কোপটি পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর
ওপর। রাস্তাঘাট ও সরু গলিগুলো পানিতে তলিয়ে থাকায় সকালে অনেক শিক্ষার্থী বাসা
থেকেই বের হতে পারেনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি হাইস্কুল অ্যান্ড
কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ
এবং কাকরাইলের লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলসহ বহু প্রতিষ্ঠানের ক্লাস ও পূর্বনির্ধারিত
অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। হঠাৎ স্কুল বন্ধের নোটিশে
চরম ভোগান্তিতে পড়েন অভিভাবকেরা।
ঢাকার জলাবদ্ধতার মূল কারণ : ঢাকার ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম
হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ। এর ফলে শহরের বেশিরভাগ প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল ভরাট হয়ে
গেছে। এছাড়া অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং ড্রেনে পলিথিন ও ময়লা জমে পানি
নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হওয়া এই সমস্যার প্রধান কারণ।
খাল ও জলাশয় ভরাট: শহরের ভেতরের অনেক প্রাকৃতিক খাল বেদখল হয়ে গেছে এবং বিভিন্ন
স্থানে আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবন তৈরি করা হয়েছে।
পাকা বা কংক্রিটের আধিক্য: রাস্তা ও বাড়ি-ঘর সব পাকা হওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি
স্বাভাবিকভাবে মাটিতে শোষিত হতে পারে না।
ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটি: ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। এছাড়া বিভিন্ন
ড্রেনে পলিথিন, বর্জ্য ও পলি জমে পানি সহজে সরতে পারে না।সমন্বয়ের অভাব: বিভিন্ন
সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সময় ড্রেন পরিষ্কার বা সংস্কারের কাজ
ঠিকমতো হয় না।
ঢাকার নতুন ‘ব্লু-পিনে’র স্বপ্ন: এক বৈজ্ঞানিক নেটওয়ার্কের আশাবাদ: অতীতের
ব্যর্থতার গ্লানি মুছে ফেলতে এবার আর জোড়াতালির সমাধান নয়, ঢাকার তলিয়ে যাওয়া ভাগ্য
ফেরাতে সম্পূর্ণ নতুন এক পথে হাঁটার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকার দুই নগর প্রশাসন।
বিচ্ছিন্নভাবে টাকা ওড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি যৌথভাবে
হাত বাড়িয়েছে এক ঐতিহাসিক মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যানের দিকে। পানি নিষ্কাশনের
পুরো প্রক্রিয়াকে একটি একক বৈজ্ঞানিক নেটওয়ার্কে বেঁধে ফেলার এই উদ্যোগ নেওয়া
হয়েছে।
এবারের মহাপরিকল্পনার মূল দর্শন হলো ‘সমন্বিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা’। ঢাকা শহরের
ভূ-প্রকৃতি, ঢাল এবং পানির প্রবাহকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিশ্লেষণ করে পুরো শহরের
ড্রেনেজ নেটওয়ার্ককে একটি একক সফটওয়্যার বা সিস্টেমের আওতায় আনা হবে। এই
পরিকল্পনার প্রধান স্তম্ভ চারটি হলো-
স্মার্ট ড্রেনেজ লাইন: অলিগলির ছোট ড্রেনগুলো থেকে পানি কীভাবে মূল ড্রেনে যাবে,
তার সুনির্দিষ্ট ঢাল বৈজ্ঞানিক উপায়ে নির্ধারণ করা।
খালের পুনরুজ্জীবন: ঢাকার বুক চিরে বয়ে যাওয়া খালগুলোকে উদ্ধার করে সেগুলোর
ধারণক্ষমতা ও নাব্য বৃদ্ধি করা, যাতে পানি দ্রুত সরতে পারে।
আউটলেট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: খাল থেকে পানি বুড়িগঙ্গা, তুরাগ বা বালু নদীতে পড়ার
পথগুলোকে বাধামুক্ত ও দখলমুক্ত করা।
হাই-টেক পাম্পিং স্টেশন: নদীর পানি যখন শহরের চেয়ে উঁচুতে থাকবে, তখন স্বয়ংক্রিয়
পাম্পের সাহায্যে শহরের পানি সেচে নদীতে ফেলার আধুনিক ব্যবস্থা।
দক্ষিণের কাণ্ডারি আইডব্লিউএম: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) তাদের
মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় পানি গবেষণা ও প্রযুক্তি
সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংকে (আইডব্লিউএম)। পুরো দক্ষিণ ঢাকাকে ১০টি
অঞ্চলে ভাগ করে এই কাজ করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে সবচেয়ে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ এবং তীব্র
জলাবদ্ধতাপ্রবণ ৫টি অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই অঞ্চলগুলোর ড্রেন, খাল ও
কালভার্টের থ্রি-ডি ম্যাপিং করা হচ্ছে। ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান
এই মহাপরিকল্পনা নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএসসিসির পুরো এলাকার মাস্টারপ্ল্যানের কাজ পুরোদমে
শুরু হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, এই মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী যদি মাঠপর্যায়ের কাজ
সম্পন্ন করা যায়, তবে ঢাকার জলাবদ্ধতার একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান সম্ভব।
উত্তরের সঙ্গী বিশ্বব্যাংক: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এই মহাপরিকল্পনা
বাস্তবায়নে হাত মিলিয়েছে বিশ্বব্যাংকের সাথে। বিশ্বব্যাংকের একটি চলমান বড়
প্রকল্পের আওতায় উত্তর ঢাকার ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা
হয়েছে। ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম নিশ্চিত করেছেন যে,
মাস্টারপ্ল্যানের একটি সুনির্দিষ্ট প্রকল্প ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে।
সংস্থাটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ফরহাদ জানান, বিশ্বব্যাংকের কারিগরি ও আর্থিক
সহযোগিতায় এই উদ্যোগের প্রাথমিক কাজ গোছানো হয়েছে এবং খুব দ্রুতই মাঠপর্যায়ের
সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নের মূল কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। উত্তর ঢাকার খালগুলোর উন্নয়ন ও
নতুন পাম্প স্টেশন স্থাপনে বিশ্বব্যাংকের এই প্রজেক্ট গেম-চেঞ্জার হতে পারে বলে মনে
করছেন কর্মকর্তারা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ
খান বলেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা সমস্যা যে জটিল আকার ধারণ করেছে, এটি নিরসনে সমন্বিত
প্ল্যান বা মাস্টারপ্ল্যান সবার আগে জরুরি। বিচ্ছিন্নভাবে ড্রেন বড় করলে বা রাস্তা
উঁচু করলে সমস্যা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয় মাত্র, সমাধান হয় না।
শত কোটি টাকার অপরিকল্পিত প্রকল্পে ডুবুডুবু চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা রূপ
নিয়েছে এক অন্তহীন ট্র্যাজেডিতে। পাহাড়ি ঢাল আর সাগরের জোয়ার-ভাটার মেলবন্ধনে গড়ে
ওঠা এই প্রাকৃতিক শহরটি এখন সামান্য বৃষ্টিতেই হাবুডুবু খায়। চাক্তাই খাল থেকে শুরু
করে বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, জিইসি মোড়, চকবাজার, আগ্রাবাদ ও
হালিশহর—সবখানে এখন পানির রাজত্ব।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে গত কয়েক বছরে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে
চারটি মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিডিএ-এর
অধীনে পরিচালিত মেগা প্রকল্পটিই অন্যতম। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও এবং হাজার
হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও চট্টগ্রামের ডুবন্ত ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। উল্টো
এবারের বর্ষায় দেখা গেছে চেনা দৃশ্য—বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের নিচে কোমর জল, আর
আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে পানির ওপর ভাসছে মানুষের আসবাবপত্র।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার মূল কারণগুলো কী: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জোয়ারের পানি আটকাতে
খালের মুখে যেসব রেগুলেটর বা স্লুইস গেট তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোর সঠিক পরিচালন
পদ্ধতি এখনও ঠিক করা যায়নি। ফলে ভারি বৃষ্টির সময় যখন গেট বন্ধ থাকে, তখন শহরের
ভেতরের পানি বের হতে না পেরে কৃত্রিম বন্যা তৈরি করে।
পাহাড় কাটা ও বালুর আস্তরণ: চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের অংশ পাহাড়গুলো নির্বিচারে কাটার
ফলে বৃষ্টির পানির সাথে বিপুল পরিমাণ বালু ও মাটি নেমে আসে। এই মাটি ড্রেন ও
খালগুলোকে ভরাট করে ফেলে। ফলে খালের গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পায়।
সংস্থাগুলোর মধ্যে রেষারেষি ও সমন্বয়হীনতা: চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক),
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে সমন্বয়ের
অভাব এখন ওপেন সিক্রেট। ড্রেন পরিষ্কারের দায়িত্ব কার, আর খাল খননের দায়িত্ব কার—এই
কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতেই পার হয় বছরের পর বছর।
চট্টগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ট্যাক্স দিই ঠিকই,
কিন্তু বর্ষা এলেই আমাদের ঘরের ভেতর ড্রেনের নোংরা পানি ঢোকে। কোটি কোটি টাকার
প্রজেক্টের কথা শুনি, কিন্তু বাস্তবে আমাদের কোনো লাভ হয়নি। প্রজেক্টের টাকা পানিতে
গেছে, আমরাও পানিতেই আছি।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে মহাবিপর্যয়: ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরিস্থিতি যখন মূলত নাগরিক
ভোগান্তি আর অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চিত্র তখন
সম্পূর্ণ মৃত্যুরূপী। গত ৫ জুলাইয়ের পর থেকে মাত্র চার দিনে চট্টগ্রামে প্রায় ১,০০০
মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এল নিনোর জলবায়ুগত প্রভাবের কারণেই
এত অল্প সময়ে এই অস্বাভাবিক ও রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে।
পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টি এবং
পাহাড়ধসের কারণে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
বিভাগটির বিভিন্ন জেলায় হতাহতের বিবরণ: কক্সবাজার: সবচেয়ে বেশি ২৩ জনের মৃত্যু
হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। চট্টগ্রামে ৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
বান্দরবানে ৬ জন মারা গেছেন। রাঙ্গামাটিতে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দুর্যোগের ফলে সাতটি জেলার প্রায় ৮ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ এখন সরাসরি পানিবন্দি
ও চরম দুর্গত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সেবার চরম বিপর্যয়: বন্যার তোড়ে এই অঞ্চলের কয়েকশ কিলোমিটার সড়ক
সম্পূর্ণ ধসে গেছে, যার ফলে বহু গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকা দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে
সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে উপড়ে গেছে শত শত বিদ্যুতের খুঁটি,
পানির নিচে তলিয়ে গেছে গ্রিড স্টেশন। ফলে বিকল হয়ে গেছে মোবাইল নেটওয়ার্ক
টাওয়ারগুলোও। লাখ লাখ মানুষ এখন অন্ধকার, বিশুদ্ধ পানিহীন এবং আধুনিক যোগাযোগহীন এক
বিচ্ছিন্ন ও আদিম দুনিয়ায় দিন কাটাচ্ছেন। বাইরের পৃথিবীর সাথে তাদের যোগাযোগের কোনো
উপায় অবশিষ্ট নেই।
আশ্রয়কেন্দ্রে হাহাকার ও ত্রাণের জন্য আর্তনাদ: বিভাগজুড়ে দুর্গত মানুষদের আশ্রয়ের
জন্য ১,৭০০টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তবে সেখানে ঠাঁই নেওয়া হাজার হাজার
মানুষের মধ্যে এখন কেবলই কান্নার রোল। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শিশুখাদ্য, শুকনো খাবার,
বিশুদ্ধ পানি এবং জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দুর্গম বন্যাকবলিত এলাকায়
বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্যরা স্পিডবোট ও
হেলিকপ্টার নিয়ে উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে
চাহিদার তুলনায় তা অত্যন্ত অপ্রতুল। এই ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম
শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত
স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করেছে যে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর
প্রভাবে আগামী অন্তত দুই দিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারি থেকে অতি ভারি
বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। সমুদ্রবন্দরগুলোতে জারি রয়েছে ৩ নম্বর স্থানীয়
সতর্ক সংকেত। আগামী ১৪-১৫ জুলাইয়ের দিকে রাজধানীতে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও,
দেশের উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাত আরও বাড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।





