, ,

আফ্রিকা থেকে স্পেনে অভিবাসন: বিশ্বসেরা হওয়ার পথে ইয়ামাল ও নিকোদের অজানা সংগ্রাম

তরুণ ও অভিজ্ঞদের দারুণ এক সমন্বয়ে গড়া দল নিয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ১৬

বছর পর পুনরায় বিশ্বকাপ শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছে স্পেন। এই ঐতিহাসিক বিজয়ে

স্পেনের হয়ে বিশ্বসেরার মুকুট পরেছেন লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের মতো তরুণ

সেনসেশনরা। তবে এই দুই প্রতিভাবান তারকার সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে আফ্রিকা মহাদেশ

ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমানো তাঁদের পরিবারের এক দীর্ঘ ও কঠিন জীবনসংগ্রামের গল্প।

স্পেনের শিরোপা জয়ের পর নিকোর বড় ভাই ঘানায় বংশোদ্ভূত ফুটবলার ইনিয়াকি উইলিয়ামস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তায় জানান যে, এই বিশ্বকাপ জয় কেবল একটি

ট্রফি নয়; বরং এটি লাখো অভিবাসী পরিবারের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। উন্নত

ভবিষ্যতের আশায় সবকিছু ছেড়ে নতুন দেশে পাড়ি জমানো মানুষদের জন্য নিকোর এই সাফল্য

প্রমাণ করে যে, কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠা থাকলে যেকোনো স্বপ্নই পূরণ করা সম্ভব।

নিকো উইলিয়ামসের পরিবারের স্পেনে আসার পথটি ছিল অত্যন্ত দুর্গম ও বিপৎসংকুল।

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে উন্নত জীবনের আশায় তাঁর বাবা ফেলিক্স উইলিয়ামস এবং মা মারিয়া

আর্থার ঘানা থেকে ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। পর্যাপ্ত খাবার ও পানি ছাড়াই

অন্তঃসত্ত্বা মারিয়া ও ফেলিক্স পায়ে হেঁটে সাহারা মরুভূমির উত্তপ্ত পথ পাড়ি দিয়ে

স্পেনের মেলিয়া শহরে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছানোর পর এক আইনজীবীর সহায়তায় লাইবেরিয়ার

নাগরিক পরিচয়ে তাঁরা রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন এবং বিলবাওয়ে থিতু হন। পরিবার চালাতে

বাবা ফেলিক্স লন্ডনে গিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করেন, আর

মা স্পেনে একসঙ্গে তিনটি কাজ করতেন। বাবা-মায়ের এই চরম সংগ্রামের দিনগুলোতে নিকোর

দেখভালের পুরো দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাঁর বড় ভাই ইনিয়াকি, যাঁকে নিকো নিজের বাবার

মতোই শ্রদ্ধা করেন। পরবর্তীতে এই দুই ভাই একসঙ্গে বিলবাওয়ের হয়ে মাঠে নামার অনন্য

রেকর্ড গড়েন এবং স্পেনে জন্ম নেওয়া নিকো শেষ পর্যন্ত নিজ দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের

অবিস্মরণীয় স্বাদ লাভ করেন।

স্প্যানিশ ফুটবলের আরেক বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামালের জীবনের গল্পও গড়ে উঠেছে

অভিবাসনের এক কঠিন ইতিহাসকে কেন্দ্র করে। তাঁর বাবা মুনির নাসরাউইয়ের জন্ম মরক্কোতে

এবং মা শেইলা এবানার জন্ম ইকুয়াটোরিয়াল গিনিতে। তবে তাঁদের পরিবারের স্পেনে আসার

গল্পটি শুরু হয়েছিল ইয়ামালের দাদি ফাতিমা রোমানি নাসরাউইয়ের হাত ধরে। অনুমতি ছাড়াই

একাকী বাসে চড়ে মরক্কো থেকে কাতালোনিয়ার মাতারো শহরে এসে পৌঁছান ফাতিমা এবং দিনরাত

অক্লান্ত পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে সন্তানদের স্পেনে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে

বার্সেলোনার উপকণ্ঠে ইয়ামালের বাবা ও মায়ের পরিচয় হয়। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে

আর্থিকভাবে সাহায্য করা দুই সহৃদয় ব্যক্তির নামানুসারে মুনির-এবানা দম্পতি তাঁদের

সন্তানের নাম রাখেন ‘লামিনে ইয়ামাল’।

শৈশবে বার্সেলোনার গ্রানোলিয়ার্স ও রোকাফোন্দার মতো দরিদ্রতম এলাকার রাস্তায় বেড়ে

উঠেছেন ১৯ বছর বয়সী লামিনে ইয়ামাল। সেখানকার সিমেন্ট-বাঁধানো মাঠেই তাঁর ফুটবলের

হাতেখড়ি হয়, যা একসময় বার্সেলোনার কোচদের নজরে পড়ে। মাত্র ৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার

বিখ্যাত যুব একাডেমি ‘লা মাসিয়া’য় সুযোগ পাওয়ার পর লিওনেল মেসি ও আন্দ্রেস

ইনিয়েস্তাদের মতো কিংবদন্তিদের অনুসরণ করে তাঁর ফুটবল প্রতিভার বিকাশ ঘটতে থাকে।

প্রতিভা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে মাত্র ১৬ বছর ৫৭ দিন বয়সে জাতীয় দলে অভিষেক ও গোল

করে স্পেনের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েন তিনি। এক বছর আগে ইউরোপিয়ান

চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর, এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে

হারিয়ে স্পেনের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার যাত্রায় ইয়ামাল নিজেকে দলের অন্যতম

গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

পোস্টটি শেয়ার করুন