ঢাকা সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নশিপের সময় নার্স শাহরিয়ার সিজান বারবার শিশুর কষ্ট দেখে খুবই ব্যাথিত হতেন। দেখা যেত, ডায়রিয়া ও লুজ মোশনের আক্রান্ত ছোট ছোট শিশু ও কিশোররা হাসপাতালের অপরিসীম চাপের মধ্যে ছিল। প্রতিদিন তাদের অসুস্থতার পেছনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ ভেজালযুক্ত খাবারই দায়ী বলে নার্স সিজান জানতে পারেন। বসন্তের মৌসুমে রাস্তার পাশে ভেজালযুক্ত গুড় দিয়ে তৈরি পিঠা ও নানা ধরনের মিষ্টি খাওয়ার জন্য বাবা-মা বাধ্য হয়, যা শিশুর অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তিনি নিজ জেলা মাগুরায় ভেজালমুক্ত খাবার তৈরির উদ্যোগ নেন।
মাগুরার খাঁটি খেজুরের গুড়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতি বেশ পুরনো। সেই চিন্তা থেকেই ভাবনা প্রথম জন্মায় তার মননে—আমাদের দেশের মানুষের হাতে যেন পৌঁছে দিতে পারে সম্পূর্ণ রসায়ন মুক্ত, খাঁটি খেজুরের গুড়।
প্রকৃতির অমূল্য উপাদানে ভরপুর এই উদ্যোগের সূচনা করেন মো. শাহরিয়ার সিজান, যিনি মাগুরা সদর উপজেলার ছয় চার গ্রামে পাটকেলবাড়ি বাজারের পেছনে ‘অর্গানিক ফুড ভ্যালি’ নামে এক ভেজালমুক্ত গুড় ও পাটালি তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছেন।
২০২৪ সালে তিনি নিজের অর্থ এবং শ্রমে এই প্রকল্প শুরু করেন। তার বন্ধু রিজু বিশ্বাস, ডেন্টাল ডাক্তার শেখ সালাউদ্দিনসহ আরও দুইজন রেজিস্টার নার্সসহ মিলিয়ে মোট চারজন মিলে তিন লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। রাজশাহীর অভিজ্ঞ গাছি এনে প্রাকৃতিক উপায়ে খেজুরের রস সংগ্রহ ও নিরাপদ গুড় প্রস্তুত করতে শুরু করেন। গাছে থেকে রস সংগ্রহের জন্য ব্যবহার হয় হাঁড়ি, যা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং কাঠের খড়ি দিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়, যাতে কোনও কৃত্রিম বা রাসায়নিক পদার্থের আলাদা ব্যবহার হয় না। এতে গুড়ের স্বাদ অতি প্রতিদিনের মতো বেশ উৎকৃষ্ট হয় এবং প্রথম বছরেই মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন তিনি।
বিশেষতা হলো, তার ক্রেতাদের সবচেয়ে বড় অংশই হয় সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সগণ, যারা স্বয়ং অসংখ্য রোগীর চিকিৎসা করেন এবং স্বস্থ্য সচেতনতার ব্যাপারে বেশি সতর্ক হন। তাদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে, সিজানের এই উদ্যোগ সফলতা লাভ করে। মাগুরার বিভিন্ন মিষ্টির দোকান এবং আশেপাশের জেলা বরাবর এই ভেজালমুক্ত পাটালি ও গুড় বিক্রি হচ্ছে।
এ বছরও তিনি ফের নতুন মৌসুমে খেজুর গাছ কেটে নতুন গাছের চারা লাগাচ্ছেন, যাতে এ ভাবধারা অব্যাহত থাকে এবং আরও বেশি মানুষের কাছে ভেজাল মুক্ত খাঁটি খাদ্য পৌঁছায়। এই তরুণ নার্সের উদ্যোগ প্রমাণ করে, কিছু সত্যিকারের ইচ্ছা, সৎ উদ্যোগ ও সামর্থ্য থাকলে সমাজে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সিজান বলেন, নার্সিং পেশার পাশাপাশি আমি এই উদ্যোগ বেছে নিয়েছি দেশের মানুষের জন্য কমপক্ষে ভেজালমুক্ত খাদ্য পৌঁছে দিতে। এতে আমার স্বয়ং অর্থ লাভ হয়, আবার সাধারণ মানুষও নিরাপদ খাবার পেয়ে উপকৃত হন। প্রথম বছর অল্প পরিসরে শুরু করে, তিন লাখ টাকায় গাছ কিনে সব খরচ বাদ দিয়ে আমি দুই লাখ টাকা লাভ করেছি। আমি আশা করছি, এ বছর আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা লাভ হবে। শুরুতে অনেকের ঠাট্টা ও নানা রকম কটু কথা শুনলেও, সফলতার সঙ্গে চলতে থাকায় এখন সবাই প্রশংসা করেন। দুই বছর ধরে এই কাজের মাধ্যমে আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক সাড়া পাচ্ছি।
তার বন্ধু রিজু বিশ্বাস বলেন, খাদ্য বিষয়ে ভেজাল এখন খুব সাধারণ একটা সমস্যা। এই পরিস্থিতিতে, নার্স শাহরিয়ার সিজান মানবোপ্রেরণাদ retailer হিসেবে উঠে এসেছেন। নিজের চোখে দেখা সমস্যার সমাধান তিনি নিজের উদ্যোগে করেছেন এবং রুগ্ন সমাজকে সুস্থ পথে ফেরাতে এই ধরনের উদ্যোগের প্রশংসা প্রাপ্য।
স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানান, বাজারে এখন ভেজালযুক্ত খাবারের আধিপত্য। বিশেষ করে বাচ্চারা এসব বিষাক্ত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই, তারা চান, আমাদের সমাজের আরও তরুণেরা যেন এই ধরনের ভেজালমুক্ত, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে এগিয়ে আসেন।
জেলার নিরাপদ খাদ্য প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালক সুমন অধিকারী বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের জন্য সাধারণত বিএসটিআই-এর অনুমোদন দরকার হয় না। তবে, বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির জন্য এই প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমোদন নেওয়া জরুরি। এর মাধ্যমে, ভেজালমুক্ত ও মানসম্পন্ন খাদ্য পণ্য বাজারে প্রবর্তনে আরও স্বচ্ছতা আন Plumbing দয়া করে।





