অন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, গুমের খেসারত শুধু ভুক্তভোগীর পরিবারই দেয় না, পুরো সমাজই শাস্তি পায়। তিনি উল্লেখ করেন, যখন কেউ গুম হয়ে যায়, তখন তার পরিবার প্রতিদিন এক অসম্ভব মানসিক ও সামাজিক চাপের মধ্যে পড়ে থাকে, যেন তারা বিচারহীনতার কারাগারে বন্দী। গত বুধবার, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) গুমের মাধ্যমে নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের আগে তিনি এ কথা বলেন।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ চিফ প্রসিকিউটর সূচনা বক্তব্যে বলেন, আমরা যে গুমের মামলার বিচার শুরু করছি, তা কেবল ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাই নয়, এটি ছিল নির্মম ও নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রীয় শাসনের চালনামাত্র। এই নীতির মাধ্যমে বিরোধী মতের হাজার হাজার মানুষকে অজ্ঞাতনামা লাশ হিসেবে পরিণত করে তাঁরা চিরতরে নিস্তেজ করে দেয়।
তিনি আরও বলেন, নীরব ও অন্ধকার কুঠরিতে হাত-পা বাঁধা বন্দীদের মাসের পর মাস বিনা বিচারে আটক রাখা ছিল একটি ভয়ঙ্কর কৌশল, যা সমাজে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। এর প্রভাব কেবল রাজনৈতিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং জনগণের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষায় নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীেও গভীরভাবে প্রবেশ করেছে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, বিরোধী চিন্তার মানুষদের গুম করে তাদের অক্ষম ও অসহায় করে তোলা ছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার এক উৎকৃষ্ট প্রয়াস। দেশের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বাহিনীর একদল সদস্য এই কর্মকাণ্ডে তাদের ভূমিকা পালন করে, ফলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যেই দীর্ঘস্থায়ী এক ভয়ঙ্কর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের মৌলিক মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও, বলপূর্বক গুম এই মর্যাদাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। আন্তর্জাতিক আইনে বলপূর্বক গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, কারণ এটি একযোগে বহু অধিকার লুণ্ঠন করে।
তাজুল ইসলাম উল্লেখ করেন, হাসিনার সরকারের গুমের কৌশল কেবল দৃশ্যপট থেকে মানুষকে সরিয়ে দেয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর নির্যাতনে দেহকে চিরতরে অক্ষম করে দিয়েছে। এখানে মৃত্যু ঘটানোর পরিবর্তে, মানুষকে জীবিত ও মৃতের মধ্যে ফেলে রাখা হয়। পরিবারগুলো জানে না, তারা সুস্থ আছেন কি-না, এই অনিশ্চয়তার মাঝে জীবন কাটাতে হয়।





