বৃহস্পতিবার, ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬, ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩

হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সহায়তা দেবে সরকার: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

হাওরাঞ্চলের কৃষকদের আগামী তিন মাস সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, কৃষকদের বিষয়টি উদ্বেগের। তিন দিন আগে

আবহাওয়া প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আমি তিনটি জেলার স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা

দিয়েছিলাম, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টি হলে যেন সতর্কতা অবলম্বন করে। বুধবার

(২৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। স্পিকার হাফিজ

উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর হয়। বেলা ১১টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের

সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য

৪০ মিনিট নির্ধারিত ছিল। প্রধানমন্ত্রীর জন্য আটটি প্রশ্ন ছিল। নির্ধারিত সময়ে

সংসদদের দুটি প্রশ্ন ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।

জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে সম্পূরক প্রশ্নে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের এমপি কলিম উদ্দিন

আহমেদ বলেন, প্রবল বর্ষণে সব হাওর তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকেরা ধান কাটতে মাঠে লড়াই

করছেন। বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বুধবার (২৯ এপ্রিল) অধিবেশন শুরুর আগে

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে এসেছি। তাকে প্রয়োজনীয়

নির্দেশনা দিয়েছি। হাওরাঞ্চলের তিন জেলাসহ ময়মনসিংহের কিছু এলাকা তীব্র বর্ষণে

ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই এলাকার যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের লোকেট করে আগামী

তিন মাস সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করব।

ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকাকে

ক্লিন এবং গ্রিন সিটি রূপে গড়ে তুলতে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় ঢাকা উত্তর ও

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নাগরিক সচেতনতা ও

সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণের

পাশাপাশি বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনসমূহ (বর্জ্য ফেলার স্থান) আধুনিকায়নের

লক্ষ্যে ল্যান্ডস্কেপিং, সবুজায়ন সচেতনতামূলক গ্রাফিতি কাজ অন্তর্ভুক্ত করে

পরিবেশসম্মতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃক

কোরিয়াভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে সমন্বিত

সার্কুলার ইকোনমি ভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তর

করার মাধ্যমে সব বর্জ্যকে জিরো বর্জ্যতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

আশা করি, এ সকল কার্যক্রম ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন ও

সবুজ ঢাকা শহর গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ঢাকাকে ক্লিন এবং গ্রিন সিটি করতে যেসব উদ্যোগ ও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সেগুলো

হচ্ছে—ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার রোড মিডিয়ান, সড়ক দ্বীপ ও উন্মুক্ত

স্থানসমূহ সবুজায়নের লক্ষ্যে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত বিভিন্ন এলাকায় নগর বনায়ন (মিয়াওয়াকি ফরেস্ট)

উন্মুক্ত মিডিয়ান জিরো সয়েল অথবা সবুজে আবৃত করা হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ বৃক্ষরোপণের

লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মেট্রোরেলের নিচের খালি অংশে (মিরপুর-১২

থেকে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত) এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (আবদুল্লাহপুর থেকে

ফার্মগেট পর্যন্ত) নিচে খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, ঢাকাকে ক্লিন এবং গ্রিন সিটি রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিবেশ

অধিদপ্তর কর্তৃক ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ

লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সেগুলো হচ্ছে—

ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ

(ডিটিসিএ) সমন্বিতভাবে আধুনিক বাস সার্ভিস ও ২৫০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ

নিচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ঢাকার বায়ুদূষণের উল্লেখযোগ্য উৎসসমূহ চিহ্নিত করা হয়েছে। সে

অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে। কালো ধোঁয়া

নির্গমনকারী যানবাহন, কনস্ট্রাকশন (নির্মাণ) কার্যক্রম ও নির্মাণসামগ্রী দ্বারা

বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।

ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ রোধে ঢাকার চারদিকে অবস্থিত অবৈধ দূষণকারী ইটভাটাসমূহ বন্ধে

উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম

পরিচালনা করা হচ্ছে।

ঢাকা মহানগরীর বায়ুদূষণ হ্রাস করার লক্ষ্যে ঢাকার সাভার উপজেলাকে ডিগ্রেডেড এয়ারশেড

ঘোষণা করা হয়েছে এবং ওই এলাকায় ইটভাটার কার্যক্রম পরিচালনা, খোলা জায়গায় বর্জ্য

পোড়ানো ইত্যাদি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ঢাকা ও আশপাশের নদী, খাল ও জলাশয় দূষণরোধে তরল বর্জ্য নির্গমনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহে

ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অদ্যাবধি ২৪৮টি প্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন করা

হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য স্থাপিত ইটিপির রিয়েল-টাইম

পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যামেরা স্থাপন চলমান রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ইতোমধ্যে

বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ নদের দূষণের উৎস এবং প্রকৃতি নির্ধারণ করা

হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরে প্রবাহিত ১৯টি প্রধান খালের দূষণের উৎস এবং প্রকৃতি

নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঢাকা শহরকে সবুজে আচ্ছাদিত করা, পরিবেশ দূষণ কমানো এবং নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধির

লক্ষ্যে বন অধিদপ্তর কর্তৃক ঢাকা উত্তর অথবা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন

বোর্ড এবং বাংলাদেশ সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে

যৌথভাবে রাস্তার মিডিয়ান, ইউলুপ, পন্ডিং এরিয়া এবং খালের পাড়সমূহে বৃক্ষরোপণ এবং

জিরো সয়েল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন প্রজাতির ৪১

হাজার ৫৬৫টি ফলদ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষের চারা রোপণ করা হয়েছে।

ঢাকা শহরের দূষণ কমানোর জন্য বিভিন্ন প্রজাতির লতা, গুল্ম ও ঘাস দ্বারা মাটি আবৃত

করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকাকে ক্লিন

এবং গ্রিন সিটি রূপে গড়ে তুলতে বনায়নযোগ্য খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ গ্রহণ

করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান এক পয়েন্ট অব অর্ডারে জলাবদ্ধতার

বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। এই

মুহূর্তে চট্টগ্রামের মানুষ পানিতে ভাসছে। তিনি চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে

প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, একটি বড় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই এটি নিরসন করতে কিছুটা সময় লাগবে। এই কষ্টের জন্য আমি আমার অবস্থান

থেকে চট্টগ্রাম শহরে বসবাসকারী সব নাগরিকের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।

আমরা চেষ্টা করছি, যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যা থেকে মানুষকে বের করে নিয়ে আসা যায়।

তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, অতিবর্ষণের কারণে বিভিন্নভাবে চট্টগ্রাম শহরের বেশ

একটি বড় অংশ তলিয়ে গিয়েছে বা মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। এই সমস্যা শুধু চট্টগ্রামে নয়,

এই সমস্যা বলা যায় সারাদেশেই ছড়িয়ে আছে। ঢাকায়ও বৃষ্টির সময় অনেক এলাকা প্লাবিত

হয়। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন,

তিনি সমগ্র বাংলাদেশে খাল খননের মাধ্যমে যেমন পানির রিজার্ভার তৈরি করেছিলেন,

একইভাবে বন্যা বা জলাবদ্ধতাও দূর করেছিলেন। আমাদের ঠিক একই কাজে আবার ফিরে যেতে

হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার এরইমধ্যে এ ধরনের কর্মসূচি নিয়েছে এবং কাজ শুরু

হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহরাঞ্চলে অসাবধানতাবশত ফেলা প্লাস্টিক, পলিথিন এবং বোতলের

কারণে খাল, ড্রেন ও নর্দমাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকার ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে খাল

খনন ও ড্রেন পরিষ্কার করছে। কিন্তু ৭-১০ দিনের মধ্যে মানুষ আবার সেগুলোতে ময়লা

ফেলে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিচ্ছে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে এবং তা অব্যাহত রাখবে, তবে জনসচেতনতা

অত্যন্ত জরুরি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে আমরা ফ্যামিলি কার্ডের কথা জনগণকে বলেছিলাম,

সেই ফ্যামিলি কার্ডটি মানুষ গ্রহণ করেছে এবং আপনি (হাসনাত আবদুল্লাহ) নিজেও সাক্ষী।

পর্যায়ক্রমে চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী

বলেন, পৃথিবীর কোনো সরকারের একবারে এটা করা সম্ভব নয়। সবার তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

প্রথম পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে দেওয়া হবে। ধীরে ধীরে বাজেট তৈরি করে কার্ড

দেওয়া বাড়ানো হবে। সে কারণে আমাদের হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী, বাজেটের ওপর চাপ পড়ার তেমন

কারণ নেই।

ফ্যামিলি কার্ডে বিতরণ করা অর্থ অর্থনীতিকে গতিশীল করতে কীভাবে ভূমিকা রাখবে, তা–ও

তুলে ধরেন তারেক রহমান। বলেন, ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া ব্যক্তিদের কেউ বলছেন জামা-কাপড়

কিনবে, কেউ বলছে বাচ্চাদের জন্য বই কিনবে। যে মানুষগুলো পাচ্ছে, তারা ব্র্যান্ডের

জিনিস ব্যবহার করে না। তারা প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার করে। তাদের ব্যবহার করা

জিনিসপত্র দেশীয় কারখানায় তৈরি। ফ্যামিলি কার্ডের টাকা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ছড়াবে।

এটা স্থানীয় শিল্পায়নে ভূমিকা রাখবে, কর্মসংস্থান বাড়াবে।

তারেক রহমান বলেন, এটা (ফ্যামিলি কার্ড) রাষ্ট্রের একটা বিনিয়োগ, যার মাধ্যমে ধীরে

ধীরে স্থানীয় শিল্প গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থান গড়ে উঠবে। তাই আমাদের হিসাব হচ্ছে

মূল্যস্ফীতি বাড়বে না, বরং কমবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন