যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন মোকাবিলায় দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা তাদের জাতীয়
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে শুরু করেছে। গত শনিবার কিউবা সরকার ‘পারিবারিক
নির্দেশিকা’ নামে একটি বিশেষ আদেশ জারি করেছে, যার লক্ষ্য হলো যে কোনো বহিঃশত্রুর
আক্রমণ থেকে সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। মূলত ‘সব মানুষের যুদ্ধ’ (War
of all the people) নামক একটি প্রাচীন কিন্তু কার্যকর প্রতিরক্ষা মতবাদের ওপর
ভিত্তি করে এই নির্দেশিকাটি তৈরি করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে
জানানো হয়েছে, কিউবার বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তুতি অত্যন্ত
গুরুত্ব বহন করছে।
কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন এই পরিস্থিতির
প্রধান কারণ। দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই
ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবার ওপর কঠোর বাণিজ্যিক ও জ্বালানি অবরোধ আরোপ করেছেন।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কিউবার গভীর নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সম্পর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি। এই অজুহাতে ট্রাম্প প্রশাসন
কিউবার চারপাশের জলসীমায় সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে, যা কিউবার
অর্থনীতিকে পঙ্গু করার পাশাপাশি দেশটির সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
কিউবা সরকার যে ‘সব মানুষের যুদ্ধ’ মতবাদ অনুসরণ করছে, তা মূলত গত শতাব্দীর শেষ
দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর গৃহীত হয়েছিল। এই প্রতিরক্ষা কৌশলের মূল বিষয় হলো
গেরিলা যুদ্ধ, স্থানীয় মিলিশিয়া গঠন এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে
পুরো জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করা। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যালেন ইয়াফে
জানিয়েছেন, কিউবার সাধারণ নাগরিকরা ঐতিহাসিকভাবেই সামরিকভাবে প্রশিক্ষিত এবং তারা
জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে কোনো বিদেশি আগ্রাসন হলে কেবল
সেনাবাহিনী নয়, পুরো জাতি সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ কিউবার ক্ষেত্রে
সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন বাহিনী এক সংক্ষিপ্ত
অভিযানে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করলেও কিউবার
পরিস্থিতি ভিন্ন। লাতিন আমেরিকা বিশ্লেষক কার্লোস মালামুদ মনে করেন, ভেনেজুয়েলার
তুলনায় কিউবার সেনাবাহিনী অধিক প্রশিক্ষিত এবং উন্নত সমরাস্ত্রে সজ্জিত। ফলে কিউবায়
সামরিক হস্তক্ষেপ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হতে
পারে।
পরিশেষে, কিউবার ওপর সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্প প্রশাসনকে
সতর্ক করেছেন। তারা মনে করেন, কিউবায় কোনো ধরনের সশস্ত্র সংঘাত শুরু হলে
যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের ঢল নামতে পারে, যা মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য
হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে কিউবার প্রতিটি পরিবার সম্ভাব্য হামলা
মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং দেশটির সরকার জনগণের মনোবল বাড়াতে নানা সুরক্ষা
প্রণালী তালিকাভুক্ত করছে। এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি পুরো লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতাকেও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।





