মঙ্গলবার, ২রা জুন, ২০২৬, ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

‘স্কাইওয়াস্প’ ড্রোন তৈরি করছে সৌদি

২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক-শিল্প তথা যুদ্ধের দৃশ্যপট দ্রুত বদলে

দিচ্ছে। যুদ্ধে দেখা গেছে কীভাবে কম খরচের চালকহীন ড্রোন ব্যবস্থা অত্যাধুনিক বিমান

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর ওপর বিশাল অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরি করেছে। পারস্য

উপসাগরীয় দেশগুলো অতীতে উন্নত ফাইটার জেট বা উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো আমদানি করা কৌশলগত সক্ষমতাকে প্রাধান্য দিলেও তা এখন

দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

ইরান বনাম ইসরায়েল-মার্কিন সংঘাত থেকে উদ্ভূত কৌশলগত দুটি শিক্ষা হচ্ছে- আত্মঘাতী

ড্রোনগুলো অনায়াসে শত্রুশিবিরের আকাশসীমায় ঢুকতে পারে এবং গণহারে উৎপাদিত এসব ড্রোন

প্রতিরোধে ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ব্যবহারে আর্থিক চাপ। ফলে সস্তা এসব ড্রোন

যুদ্ধের অর্থনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।

পারস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের জন্য মূল উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে

এসব আত্মঘাতী ড্রোন। প্রতিটি শাহেদ ড্রোনের আনুমানিক মূল্য ২০ হাজার থেকে প্রায় ৩৫

হাজার মার্কিন ডলার। এই সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে যে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করা

হয় তার খরচ ড্রোনের চেয়ে বহুগুণ বেশি। এই উদীয়মান বাস্তবতার কারণে পারস্য অঞ্চলের

সামরিক নীতি নির্ধারকরা তাদের চিরাচরিত প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকারগুলো পুনর্মূল্যায়ন

করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সৌদি আরব এখন দীর্ঘপাল্লার নিজস্ব ‘শাহেদ-স্টাইল’

আত্মঘাতী ড্রোন তৈরিতে উদ্যোগী হয়েছে।

সৌদি আরবের নতুন কৌশল ‘স্কাইওয়াস্প’ ড্রোন

এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে সৌদি আরব ‘স্কাইওয়াস্প’ ড্রোন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এটি

সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত একটি ‘ওয়ান-ওয়ে’ বা আত্মঘাতী ড্রোন, যা মূলত

কিংডমের নিজস্ব প্রতিরক্ষা-শিল্পের লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি আক্রমণাত্মক প্রতিরোধ

ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

এই উদ্যোগটি সৌদি সামরিক চিন্তাভাবনার একটি বড় বিবর্তন। এটি মূলত কেবল

প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে সস্তা ও দীর্ঘমেয়াদি আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবস্থার দিকে

ধাবিত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই কর্মসূচিতে মার্কিন প্রযুক্তি, সৌদির শিল্প সক্ষমতা

এবং ইরানের যুদ্ধক্ষেত্রের উদ্ভাবন থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার এক অনন্য সংমিশ্রণ ঘটেছে।

ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়ার তথ্য মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাভিত্তিক ভেক্টর

ডিফেন্স দ্বারা তৈরি এই ড্রোনের পাল্লা প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার। ফলে সৌদি ভূখণ্ড

থেকেই ইরানের ভেতরের যে কোনো কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হবে এসব ড্রোন।

এর প্রি-প্রোগ্রামড নেভিগেশন আর্কিটেকচার ইঙ্গিত দেয়, এটি সম্পূর্ণ

স্বায়ত্তশাসিতভাবে মিশন পরিচালনা করতে পারে, যা ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা জ্যামিংয়ের

ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

রিয়াদের নিকটবর্তী এলাকায় এই ড্রোনের জন্য একটি ডেডিকেটেড উৎপাদন কারখানা নির্মাণ

করা হচ্ছে। সৌদি আরবের এসব উদ্যোগ এটাই প্রমাণ করে, এই আঞ্চলিক সংঘাতের শিক্ষা

স্থায়ী শিল্প সক্ষমতায় রূপান্তর করতে বদ্ধপরিকর সৌদি সরকার।

এসআর-২ ভিক্টর ডিফেন্স নামক একটি যৌথ উদ্যোগের অধীনে এসব ড্রোনের উৎপাদন প্রক্রিয়া

চলছে। এটি মার্কিন ড্রোন প্রস্তুতকারক ভেক্টর ডিফেন্স এবং সৌদিভিত্তিক এসআর-২

ডিফেন্স সিস্টেমস একত্রিত করেছে।

এই প্রকল্পটি সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার লক্ষ্য হলো

এই দশকের শেষের মধ্যে দেশের মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ৫০ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে

স্থানীয়করণ করা। ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল সৌদি আরব এখন নিজস্ব

উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে সংকটের সময় বিদেশি সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরতা কমাতে

চাইছে।

সৌদি আরবের এই ড্রোন উদ্যোগ মূলত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান ড্রোন প্রতিযোগিতারই

একটি অংশ। সংযুক্ত আরব আমিরাতও (ইউএই) একইভাবে বিদেশি প্রতিরক্ষা সরবরাহকারীদের ওপর

নির্ভরতা কমাতে নিজস্ব প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম তৈরি করছে।

ভবিষ্যতের যুদ্ধপ্রস্তুতির জন্য সৌদি আরব এখন বহুমুখী পন্থা অবলম্বন করছে, যার

মধ্যে রয়েছে আক্রমণাত্মক ড্রোন তৈরি, ড্রোনপ্রতিরোধী প্রযুক্তি এবং মার্কিন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক।

পোস্টটি শেয়ার করুন