বাংলার রাজনীতির অন্যতম দিকপাল এবং মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি সংগঠক তোফায়েল আহমেদের
অন্তিম যাত্রা সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটেয় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
মাঠে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত
অংশগ্রহণ ও অশ্রুসিক্ত ঢল লক্ষ্য করা গেছে। জানাজার পূর্বে এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বকে
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। এর আগে দুপুর দেড়টার দিকে
হেলিকপ্টারযোগে তার মরদেহ ঢাকা থেকে ভোলার বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাসস্ট্যান্ড
সংলগ্ন হেলিপ্যাডে আনা হলে সেখানে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিজ জেলার মাটি
ও মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এই নেতাকে তার পৈতৃক গ্রাম দক্ষিণ দীঘলদি ইউনিয়নের
কোড়ালিয়ার পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের পাশেই সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া
হয়েছে।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদ
ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন অনন্য সাধারণ। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
অধ্যয়নকালে তিনি তুখড় ছাত্রনেতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক
গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন। ঐ বছরের ২৩
ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে তিনি শেখ মুজিবুর
রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক
হিসেবে ১৯৭১ সালে তিনি মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলীয় অধিনায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ
দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিযুক্ত
হন এবং পরবর্তী দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মোট ৯ বার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে
সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
বর্ণাঢ্য এই রাজনৈতিক পথচলায় তোফায়েল আহমেদ ১৯৯৬ এবং ২০১৪ সালে অত্যন্ত দক্ষতার
সাথে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব সামলেছেন।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দীর্ঘ ৩৩ মাস কারান্তরালে থাকলেও আদর্শ
থেকে বিচ্যুত হননি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি
জনসেবায় সক্রিয় ছিলেন। ১২টি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে ৯টিতে জয়ী হওয়া এই নেতা
কেবল ভোলার মানুষের প্রিয় অভিভাবকই নন, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক
অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছেন। তার প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল
শূন্যতার সৃষ্টি হলো।





