ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সফল পরাশক্তি ব্রাজিলের বিপক্ষে জয় যেকোনো দলের জন্যই এক
রূপকথার মতো। তবে মাঠের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সেই রূপকথাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে
ব্রাজিল বধের এক অনন্য মহাকাব্য লিখলো নরওয়ে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের
আক্রমণভাগকে বোতলবন্দি করে এবং নিজেদের সুযোগগুলোর নিখুঁত ব্যবহারে ব্রাজিলকে
স্তব্ধ করে দিয়েছে তারা। ঐতিহাসিক জয়টি নরওয়েজিয়ান ফুটবলের ইতিহাসেই এক
স্বর্ণাক্ষরে লেখা অধ্যায় হয়ে থাকবে।
প্রথমার্ধ গোলশূন্যতে শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার বাড়িয়ে দেয় ব্রাজিল।
কিন্তু গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও লিড নিতে পারেনি সেলেসাও। এদিকে ম্যাচের ৭৯তম ও
৯০তম মিনিটে ব্রাজিলের জালে দুইবার বল পাঠিয়ে নরওয়েকে দুই গোলে এগিয়ে দিলেন আর্লিং
হালান্ড।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছে
ব্রাজিল-নরওয়ে। ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল টানটান উত্তেজনা। ম্যাচের শুরুতেই ব্রাজিলের
মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল ইউরোপের দলটি।
ম্যাচের চতুর্থ মিনিটেই ব্রাজিলের জালে বলও পাঠিয়ে দিয়েছিল নরওয়ে। সঙ্গে সঙ্গে
স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো স্টেডিয়াম। কিন্তু অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল করেন
রেফালি। তাতেই যেন প্রাণ ফিরে পায় ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা। আলিসনকে ফাঁকি দিয়ে
অফসাইডে দেওয়া গোলটি ছিল প্যাটট্রিক বার্গের।
এদিকে ম্যাচের দশম মিনিটে লিড নিতে পারতো নরওয়ে। ডি-বক্সের ভেতরে ম্যাথিউস কুনহাকে
ফাউল করেন নরওয়ের এক ডিফেন্ডার। ভিএআরের মাধ্যমে ফাউল ঘোষণা করে পেনাল্টি দেন
রেফারি। পেনাল্টি কিক নিতে আসেন ব্রুনো গুইমারেস। তার নেওয়া শটটি বীরত্ব দেখিয়ে
ঠেকিয়ে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নাইল্যান্ড।
পেনাল্টি মিসের ধাক্কা সামলে প্রথমার্ধের শেষদিকে ম্যাথিউস কুনহা এবং মার্তিনেল্লি
দূরপাল্লার শটে গোল করার চেষ্টা করলেও নরওয়ের ডিফেন্ডাররা তা প্রতিহত করেন। ফলে
আক্রমণের পর আক্রমণ করেও গোলহীনভাবেই বিরতিতে যেতে হয় লাতিন আমেরিকার দলটিকে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই একাদশে দুটি পরিবর্তন আনে নরওয়ে। মাঠে নামেন অস্কার বব ও
আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ।
এদিকে ম্যাচের ৫৮তম মিনিটে কুনহা পরবির্তে এন্দ্রিককে মাঠে নামান কার্লো আনচেলত্তি।
মাঠে নামার প্রথম মিনিটেই গোলে এক সুবর্ণ সুযোগ মিস করেন এই উদীয়মান ব্রাজিলিয়ান
তারকা। বামপ্রান্ত থেকে আক্রমণে আসা ভিনিসিয়ুস এক দুর্দান্ত পাস দেন এন্দ্রিক করে।
বল নিয়ে নরওয়ের বক্সের ভেতরে ঢুকে যান তিনি। সামনে ছিলেন কেবল গোলরক্ষক। টোকা দিয়ে
বল জালে জড়াতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বলটি চলে যায় গোলবার পাশ দিয়ে।
৬২তম মিনিটে বক্সের খানিক বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক শট নিয়েছিলেন রায়ান। এবারও
নরওয়ের ত্রাতা হয়ে উঠেন গোলরক্ষক নাইল্যান্ড। এক মিনিট পরেই দুর্দান্ত এক সুযোগ
নষ্ট করেন গুইমারেস।
ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে আসে সেই মাহেদ্রক্ষণ। না, কোনো গোল হয়নি। এসময় বদলি খেলোয়াড়
হিসেবে মাঠে নামেন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার জুনিয়র। তার সঙ্গে
দানিলোকেও মাঠে নামান কোচ আনচেলত্তি।
ম্যাচের ৭৯তম মিনিটে নিউজার্সির পুরো স্টেডিয়ামকে যেন স্তব্ধ করে দেন নরওয়ের
ম্যানচেস্টার সিটি তারকা আর্লিং হালান্ড। দুর্দান্ত এক হেডে আলিসনকে পরাস্ত করেন
তিনি। তাতেই ১-০ গোল ব্যবধানে এগিয়ে যায় নরওয়ে।
ব্রাজিলের হেক্সা মিশন চূর্ণ করল হালান্ডের জোড়া গোল
বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলের রক্ষণভাগ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জোড়া গোল করলেন নরওয়ের
গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড। প্রথমার্ধে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারদের কড়া পাহারায় শান্ত
থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে সেলেসাওদের জাল কাঁপান এই ম্যানচেস্টার সিটি
স্ট্রাইকার।
ম্যাচের ৭৯তম মিনিটে নিউজার্সির পুরো স্টেডিয়ামকে যেন স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন নরওয়ের
ম্যানচেস্টার সিটি তারকা আর্লিং হালান্ড। দুর্দান্ত এক হেডে আলিসনকে পরাস্ত করেন
তিনি। তাতেই ১-০ গোল ব্যবধানে এগিয়ে যায় নরওয়ে।
প্রথম গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ম্যাচের শেষভাগে ব্রাজিলের কফিনে শেষ পেরেকটি
ঠোকেন তিনি। ডি-বক্সের ঠিক বাইরে বল পেয়ে ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে বাঁ পায়ের এক
অবিশ্বাস্য ও বুলেট গতির শট নেন তিনি।
স্পিডোমিটারে শটটির গতি ধরা পড়ে ঘণ্টায় ১২৮ কিলোমিটার! ব্রাজিলের বিশ্বমানের
গোলরক্ষক আলিসন বেকার ডাইভ দিলেও বল রকেটের গতিতে জালের কোণায় আশ্রয় নেয়। হালান্ডের
দানবীয় জোড়া গোলেই হেক্সার স্বপ্ন শেষ হয় ব্রাজিলের। ম্যাচটি শেষ হয় ২-১ গোল
ব্যবধানে।
অশ্রুসিক্ত চোখে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে নেইমারের বিদায়
বিশ্বকাপ জয়ের আজন্ম লালিত স্বপ্ন আবারও চূর্ণ হলো। সেই সঙ্গে যবনিকা পড়ল
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের। নরওয়ের কাছে
২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ১৬ থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে
অবসরের প্রকাশ্য ঘোষণা দিলেন নেইমার জুনিয়র। কাকতালীয়ভাবে, ১৬ বছর আগে নিউ জার্সির
মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই শুরু হয়েছিল তার পথচলা, আর সেই একই মাঠেই আজ শেষ হলো এক বর্ণিল
অধ্যায়।
ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের গ্লোভো টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কান্নায় ভেঙে পড়েন নেইমার।
তিনি বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি, সত্যিই অনেক চেষ্টা করেছি। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের
ইতি ঘটেছে। এখন সব শেষ। এখানেই আমার শুরু হয়েছিল, এখানেই শেষ হলো।’ সরাসরি অবসরের
কথা না বললেও তার এই মন্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতালিয়ান সাংবাদিক
ফ্যাব্রিজিও রোমানোর দেওয়া ‘ব্রেকিং নিউজ’ নিশ্চিত করছে যে সেলেসাওদের জার্সিতে আর
দেখা যাবে না এই জাদুকরকে।
১৯৯০ সালের পর বিশ্বকাপে এটিই ব্রাজিলের সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্স। নরওয়ের কাছে
হেরে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেওয়ায় সেলেসাওদের শিরোপা খরা আরও দীর্ঘ হলো। ১৯৫৮ সালে
প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর এটিই হতে যাচ্ছে ব্রাজিলের দীর্ঘতম শিরোপাহীন সময়—২০৩০
বিশ্বকাপ নাগাদ যা ২৮ বছরে দাঁড়াবে। গ্রুপ পর্বে অনিয়মিত থাকলেও বিদায়ী ম্যাচে যোগ
করা সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্যবধান কমিয়েছিলেন নেইমার (২-১), কিন্তু তা দলের
পরাজয় এড়াতে যথেষ্ট ছিল না।
একটি সোনালি ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান:
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই অভিষেক হয়েছিল নেইমারের।
এরপর ১৬ বছরে ব্রাজিলের হয়ে খেলেছেন ১৩০টি ম্যাচ। ৮০টি গোল করে তিনি দেশটির
ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা, যা পেলের করা রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া তার নামের
পাশে রয়েছে ৫৮টি অ্যাসিস্ট। নেইমারের বর্ণিল ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রাপ্তি ২০১৩
সালের ফিফা কনফেডারেশনস কাপ এবং ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক জয়।
তবে চারটি বিশ্বকাপ খেলেও সোনালি ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখা হলো না তার। থিয়াগো সিলভার পর
দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান হিসেবে চারটি বিশ্বকাপ খেলেও শিরোপাহীন থেকে বিদায় নিতে হলো
তাকে।
নেইমারের এই বিদায়ের খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ
ঘাসে যে চঞ্চল তরুণ একদিন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নিয়ে পা রেখেছিলেন, ৩৪ বছর বয়সে সেই মাঠ
থেকেই বিদায় নিলেন এক বুক হতাশা আর অপ্রাপ্তি নিয়ে। ফ্যাব্রিজিও রোমানো তার পোস্টে
নেইমারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে লেখেন, ‘সবকিছু এখন শেষ।’
নেইমারের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে একটি যুগের সমাপ্তি ঘটল। কোয়ার্টার
ফাইনালে উঠতে না পারার আক্ষেপ আর কিংবদন্তি নেইমারের বিদায়—সব মিলিয়ে এই পরাজয়
ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের জন্য এক গভীর ক্ষত হয়ে থাকবে।
ব্রাজিল বধের অন্যতম নায়ক নরওয়ের গোলরক্ষক
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে বিদায় করে নরওয়ের প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে
ওঠার রূপকথায় সব আলো কেড়ে নিয়েছেন আর্লিং হালান্ডে। তার জোড়া গোলের বন্দনায় মুখর
ফুটবলবিশ্ব। কিন্তু ম্যাচজুড়ে নরওয়ের গোলপোস্টের নিচে যে প্রাচীর গড়ে তুলেছিলেন
তাদের গোলরক্ষক এরিয়ান নাইল্যান্ড, হালান্ড-ঝড়ের তীব্রতায় তার সেই অবিশ্বাস্য
বীরত্ব কিছুটা আড়ালেই রয়ে গেল। অথচ তিনি পেনাল্টিটা না থামালে ম্যাচের গল্পটা
অন্যরকমও হতে পারত।
ম্যাচের প্রথমার্ধে একের পর এক আক্রমণ চালাচ্ছিল সেলেসাওরা, তখন নরওয়ে ডিফেন্সকে
একাই নেতৃত্ব দিয়েছেন নাইল্যান্ড। প্রথমার্ধের শুরুতেই ব্রাজিল পেনাল্টি পায়, তখন
স্টেডিয়ামের সবাই ধরেই নিয়েছিল লিড নিচ্ছে ব্রাজিল। কিন্তু ব্রুনো গুইমারাসের শটটি
ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রুখে দেন নাইল্যান্ড। এই একটি সেভ পুরো নরওয়ে দলের
আত্মবিশ্বাস বদলে দেয়।
শুধু পেনাল্টি সেভই নয়, প্রথমার্ধের শেষদিকে ম্যাথিউস কুনহার দূরপাল্লার শট এবং
গ্যাব্রিয়েল মার্তেনেল্লির ভলিও কর্নারের বিনিময়ে প্রতিহত না করলে প্রথমার্ধেই
ম্যাচ থেকে ছিটকে যেত নরওয়ে।
আর বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেই গোলের এক দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন এন্দ্রিক।
বামপ্রান্ত থেকে আক্রমণে আসা ভিনিসিয়ুস এক দুর্দান্ত পাস দেন এন্দ্রিককে। বল নিয়ে
নরওয়ের বক্সের ভেতরে ঢুকে যান তিনি। সামনে ছিলেন কেবল গোলরক্ষক। টোকা দিয়ে বল জালে
জড়াতে চেয়েছিলেন তিনি। বীরত্বের সঙ্গে ব্রাজিলকে হতাশ করেন নরওয়ের গোলরক্ষক।
এদিকে ভিনিসিয়ুসের গতিময় আক্রমণগুলোর সামনে বিশ্বস্ত দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।
ম্যাচের শেষ মুহূর্তে নেইমারের পেনাল্টি শটটি তিনি ঠেকাতে না পারলেও পুরো ৯০ মিনিটে
ব্রাজিলের বিশ্বমানের আক্রমণভাগকে যেভাবে হতাশ করেছেন, তা নরওয়েকে ম্যাচ জেতাতে
হালান্ডের গোলের মতোই সমান ভূমিকা রেখেছে।
৩৬ বছরের মধ্যে ব্রাজিলের সবচেয়ে বাজে বিশ্বকাপ
বিশ্বকাপ
প্রতিপক্ষ দল
বিদায়ের পর্ব
২০০৬ (জার্মানি)
ফ্রান্স
কোয়ার্টার ফাইনাল
২০১০ (দক্ষিণ আফ্রিকা)
নেদারল্যান্ডস
কোয়ার্টার ফাইনাল
২০১৪ (ব্রাজিল)
জার্মানি
সেমিফাইনাল
২০১৮ (রাশিয়া)
বেলজিয়াম
কোয়ার্টার ফাইনাল
২০২২ (কাতার)
ক্রোয়েশিয়া
কোয়ার্টার ফাইনাল
২০২৬ (উত্তর আমেরিকা)
নরওয়ে
রাউন্ড অফ ১৬
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ধারে ভারে আর দশটা
দলের থেকে বরাবরই এগিয়েই থাকে লাতিন এই পরাশক্তি। যে কোনো টুর্নামেন্টে হলুদ
জার্সিধারীদের চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছাড়া যেন আর কোনো ফলাফলে মান বাঁচে না। কিন্তু সময়ের
সঙ্গে সঙ্গে সেসব এখন কেবল ইতিহাস।
সর্বশেষ চলমান বিশ্বকাপের আগে প্রথা ভেঙে বিদেশি কোচ নিয়োগ দিয়েও ভাগ্য খুব একটা
পাল্টাল না। উল্টো কোয়ার্টারের আগেই ছিটকে যেতে হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ৩৬
বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্স এবারের আসরে। ১৯৯০ সালের
পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে সেলেসাওদের।
গত ৯টি বিশ্বকাপ ধরে ব্রাজিল অন্তত শেষ আট বা কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা নিশ্চিত করে
আসছিল। কার্লো আনচেলত্তির দল এবার সেই ধারাবাহিকতাও ধরে রাখতে পারেনি। এর আগে ১৯৯০
সালে ইতালি বিশ্বকাপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে শেষ ষোলোর ম্যাচে ১-০
গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। এরপর আর কখনোই কোয়ার্টার ফাইনালের আগে থামেনি
তারা। ৩৬ বছর পর নরওয়ে যেন ফিরিয়ে আনল সেই ১৯৯০ সালের দুঃস্মৃতি।
২০০৬, ২০১০, ২০১৮ এবং ২০২২—এই চারবারই তাদের দৌড় থেমেছিল শেষ আটে। ঘরের মাঠে ২০১৪
সালে জার্মানির কাছে সেই দুঃস্বপ্নের ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার ম্যাচেও তারা
সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল। কিন্তু এবার শেষ ষোলোতেই আটকা পড়ল আনচেলত্তির
দল। নেইমারের অশ্রুসজল বিদায় আর মাঠের ছন্নছাড়া ফুটবল মিলে ২০২৬ বিশ্বকাপ এখন
ব্রাজিলের জন্য আরেকটা দীর্ঘশ্বাস হয়েই থাকল। একই সঙ্গে ২০০২ বিশ্বকাপের পর থেকে
নকআউটে ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে জয়টাও অধরাই থেকে গেল ব্রাজিলের।
কার্লো আনচেলত্তির ওপর আস্থা ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে
গেছে ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আরেকটি ব্যর্থ আসর শেষে গুঞ্জন উঠেছে,
সেলেসাওদের ডাগআউটে সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ কোচ কার্লো আনচেলত্তি থাকবেন কি না।
এরই মধ্যে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) জানিয়েছে, বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে
গেলেও কোচ কার্লো আনচেলত্তির ওপর আস্থা হারাচ্ছে না তারা। চুক্তি অনুযায়ী ২০৩০
বিশ্বকাপ পর্যন্ত সেলেসাওদের ডাগআউটে এই ইতালিয়ান কোচই থাকছেন বলে নিশ্চিত করেছে
দেশটির ফেডারেশন।
ব্রাজিলের জাতীয় দলের নির্বাহী পরিচালক রদ্রিগো কায়তানো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন,
ব্যর্থতার পরও আনচেলত্তিকে ছাঁটাই করার কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদী
পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাকে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালে রিয়াল মাদ্রিদের পাট চুকিয়ে ব্রাজিলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন কার্লো
আনচেলত্তি। বাছাইপর্বের শেষ দিক দলের ডাগআউটে যুক্ত হন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার বছর
খানেকের মাথায় বিশ্বকাপ খেলতে নেমে শুরুটা কিছুটা এলোমেলো হলেও ধীরে ধীরে ছন্দে
ফিরছিল ব্রাজিল। তবে প্রথম বড় পরীক্ষাতেই নরওয়ের কাছে হারতে হয়েছে।
কোয়ার্টারের আগেই বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেলেও এই মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করতে চায় না
সিবিএফ। কায়তানো বলছিলেন, এখন আমাদের মূল লক্ষ্য হলো স্বাভাবিক কাঠামোর মধ্যে থেকে
কাজ করা। কোচ ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাবেন। যেখানে যেখানে পরিবর্তন
প্রয়োজন, তা করা হবে। পরবর্তী বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে আমাদের অন্তত
শান্ত পরিবেশ দরকার।’
নরওয়ের কাছে হারের পর ড্রেসিংরুমের পরিবেশ কেমন ছিল, তা লুকাতে চাননি কায়তানো।
তবে গত ৩৮ দিন ধরে আনচেলত্তির অধীনে দলের ফুটবলার ও স্টাফরা যেভাবে কঠোর পরিশ্রম
করেছেন, তার প্রশংসাও করেছেন। তিনি বলেন, অবশ্যই আমরা এখনো এই ধাক্কা সামলে ওঠার
চেষ্টা করছি। ফুটবলার, স্টাফ, কোচিং প্যানেল—সবাই অত্যন্ত দুঃখিত, হতাশ ও মর্মাহত।
কিন্তু তাই বলে গত কিছুদিন আমরা একসাথে যে সময়টা কাটিয়েছি, তাকে পুরোপুরি ব্যর্থ
বলা যাবে না। সিবিএফ পরিচালকের মতে, টুর্নামেন্টজুড়ে ব্রাজিল ধাপে ধাপে উন্নতি
করছিল।
এখনই হাল ছাড়ছেন না কার্লো আনচেলত্তিও। হতাশ হলেও এখানেই শেষ দেখছেন না কিংবদন্তী
এই কোচ, ‘স্বাভাবিকভাবেই হতাশ। তবে এটাই শেষ নয়, নতুন করে শুরু করতে হবে।’





