যুদ্ধের আগেই নেওয়া সুপরিকল্পিত প্রস্তুতির কারণে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার
ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে ইরান। পাশাপাশি পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষমতাও
রয়েছে। খবর মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন মতে, ইসরায়েলি-মার্কিন হামলায় ইরানের অবকাঠামোর ব্যাপক
ক্ষতি হয়েছে এবং শীর্ষ নেতারা নিহত হয়েছেন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যক্তিগত
প্রতিবেদনের বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা বলছেন, সংঘাতের আশঙ্কায় নেওয়া কার্যকর পরিকল্পনার
কারণে ইরান তাদের মিসাইল এবং ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছে।
একই সঙ্গে তারা তাদের সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রভাবকেও সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে
পেরেছে। এই তথ্যগুলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া
তথ্যের চেয়ে ভিন্ন ও অনেক বেশি সূক্ষ্ম চিত্র তুলে ধরে। ইরানের আগে থেকে করা সামরিক
পরিকল্পনার কার্যকারিতা এমন সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে যে তারা বর্তমান যুদ্ধবিরতিকে
নতুন করে যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
গত সোমবার ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘ইরান
সামরিক এবং অন্য সব দিক দিয়ে সম্পূর্ণভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে।’ গত সপ্তাহে
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সময় তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের সব সামরিক
লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং তার চেয়েও বেশি কিছু করেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শীর্ষ সামরিক নেতারা নিহত হলে তাদের স্থলাভিষিক্ত
কারা হবে—ইরানের এমন আগাম পরিকল্পনার কারণে যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে বড় নেতাদের
লক্ষ্য করে হামলা হলেও তাদের কমান্ড কাঠামোতে খুব একটা বিঘ্ন ঘটেনি। ইউরোপীয় এবং
উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন বলছে, ইরানের কাছে এখনো দূরপাল্লার
মিসাইলের বিশাল মজুত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও জানান, তাদের অস্ত্রাগারে এখনো
হাজার হাজার ড্রোন রয়েছে।
ইরানের মিসাইল মজুত একটি গোপন বিষয়। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে দাবি
করেছেন, ইরানের সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও অন্তত দুই থেকে তিন
সপ্তাহ হামলার প্রয়োজন ছিল। তবে অন্যরা বলছেন, এটি একটি অতি আশাবাদী ধারণা হতে
পারে। কারণ, এতে আরও অনেক বেশি সময় লাগতে পারে এবং ইরানের শিল্প ও পারমাণবিক
সক্ষমতা এখনো পুরোপুরি শেষ নাও হতে পারে।
ইরান তাদের মিসাইল লাঞ্চার এবং ড্রোন অবকাঠামো সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। তারা
নিয়মিতভাবে লাঞ্চারগুলোর জায়গা পরিবর্তন করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সেগুলো
দ্রুত ধ্বংস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই চিত্র ৮ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দেওয়া
মূল্যায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ইরানে মার্কিন হামলার অপারেশনাল নাম উল্লেখ করে
বলেছিলেন, ‘যেকোনো বিচারে এপিক ফিউরি ইরানের সামরিক বাহিনীকে তছনছ করে দিয়েছে এবং
আগামী কয়েক বছরের জন্য তাদের লড়াই করার ক্ষমতা নষ্ট করে দিয়েছে।’
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। পেন্টাগন গত
বৃহস্পতিবার আগের দেওয়া হেগসেথের মন্তব্যের দিকেই ইঙ্গিত করেছে। সেখানে ইরানি
নেতৃত্বের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছিল, ‘আপনারা কোন সামরিক সরঞ্জাম কোথায়
সরাচ্ছেন, তা আমরা জানি। আপনারা যখন আপনাদের বিধ্বস্ত স্থাপনাগুলো পরিষ্কার করতে
ব্যস্ত, আমরা তখন দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছি।’
ট্রাম্প গত বছর জুন মাসে বলেছিলেন, ওই মাসের হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক
স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। হেগসেথ তার ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক
স্থাপনার ‘ধুলিকণা’ এখন মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘তাদের কমান্ড
এবং কন্ট্রোল ব্যবস্থা এতটা ধ্বংস হয়ে গেছে যে তারা নিজেরা কথা বলা বা সমন্বয় করতে
পারছে না।’
তবে বৃহস্পতিবার কংগ্রেসের কাছে দেওয়া এক বৈশ্বিক মূল্যায়নে ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স
এজেন্সি (ডিআইএ) জানিয়েছে, ‘যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের কাছে এখনো হাজার
হাজার মিসাইল এবং ড্রোন রয়েছে, যা পুরো অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন এবং মিত্র
বাহিনীর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
পশ্চিমা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরানি শাসনব্যবস্থা এখনো স্থিতিশীল এবং
ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। যদিও সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি
কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী লারিজানির মতো শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুতে দেশটির রাজনৈতিক
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় প্রভাব ফেলেছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের, যেটিতে যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দিয়েছিল,
তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ইরানের নেতারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটিকে সারাদেশে
প্রাদেশিক পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করার পরিকল্পনা করেন। একে বলা হয় ‘মোজাইক
প্রতিরক্ষা কৌশল।’ এটি সামরিক কমান্ডারদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আরও বেশি
ক্ষমতা দেয়। গত বছর ইরানে ইসরায়েলের হামলার পর দেশটি নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী
সংস্থা গঠন করে এবং তাদের নেতৃত্ব কৌশলে পরিবর্তন আনে। এর মধ্যে ছিল শীর্ষ কমান্ডার
এবং সাবেক নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা হলে দ্রুত লোকবল পরিবর্তনের প্রস্তুতি।
এসব জরুরি পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও ইরান হামলার কারণে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির
সম্মুখীন হচ্ছে। কিছু উপসাগরীয় এবং ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ চলতে থাকলে এই
গ্রীষ্মে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছাতে পারে।
ইসরায়েলের হিসাব বলছে, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ব্যালিস্টিক
মিসাইল ছিল। ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের প্রতিরক্ষা প্রধান বেকা ওয়াসারের মতে, উপসাগরীয়
দেশ এবং ইসরায়েলের সরকারি রিপোর্ট বলছে, ইরান এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৮৫০টি
ব্যালিস্টিক মিসাইল, ৪ হাজার ৭০০টির বেশি শাহেদ ড্রোন এবং প্রায় ৮০টি প্রচলিত ক্রুজ
মিসাইল ছুড়েছে।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা হয়েছে ১৩ এপ্রিল বাহরাইনে, তবে সেটি
সরাসরি ইরান থেকে নাকি ইরাকে থাকা ইরানের প্রক্সিদের কাছ থেকে করা হয়েছে, তা স্পষ্ট
নয়। ৬ এপ্রিল এক কার্যনির্বাহী আপডেটে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, গত ২৮
ফেব্রুয়ারি বর্তমান অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে তারা ইরানে ১৩ হাজারের বেশি
লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
সেখানে বলা হয়েছে, ১৫৫টির বেশি ইরানি জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে এবং মার্কিন বাহিনী
ইরানের কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল সাইটসহ বিভিন্ন
লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে হামলা চালিয়েছে।





