বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের মালিক ইলন মাস্ককে তলব
করেছে ফ্রান্সের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। শুধু মাস্কই নন, এক্সের সাবেক প্রধান
নির্বাহী কর্মকর্তা লিন্ডা ইয়াক্কারিনোকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সমন জারি করেছে
প্যারিস প্রসিকিউটরের কার্যালয়।
শিশু নির্যাতনমূলক কনটেন্ট প্রচার, ডিপফেক ছবি তৈরি এবং প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম
ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে মাস্কের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই
তদন্ত করা হচ্ছে। গত বছরের জানুয়ারি মাসে প্যারিস প্রসিকিউটরের সাইবার ক্রাইম
ইউনিট এ তদন্ত শুরু করে। তাদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক্সের এআই চ্যাটবট
‘গ্রোক’।
তদন্তকারীদের দাবি, গ্রোকের মাধ্যমে হলোকাস্ট বা নাৎসি গণহত্যাকে অস্বীকার করে
আপত্তিকর তথ্য প্রচার এবং যৌন উত্তেজক ডিপফেক ছবি তৈরির মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত
হয়েছে।
অপতথ্য ও ঘৃণামূলক তথ্য ছড়ানো বন্ধে কাজ করা সংস্থা সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল
হেট (সিসিডিএইচ) গত জানুয়ারির শেষ দিকে দাবি করেছিল, মাত্র ১১ দিনে গ্রোক প্রায় ৩০
লাখ আপত্তিকর ছবি তৈরি করেছে, যার মধ্যে ২৩ হাজার ছবি শিশুদের মতো দেখতে ছিল।
এছাড়া, এক্স প্ল্যাটফর্মের পক্ষপাতমূলক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় তথ্য
প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থাকে ম্যানিপুলেট করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। গত
ফেব্রুয়ারি মাসে প্যারিসে এক্সের কার্যালয়ে তল্লাশি চালানোর পর তদন্তের পরিধি আরও
বাড়ানো হয়।
প্যারিস প্রসিকিউটরের কার্যালয় জানিয়েছে, ঘটনার সময় দায়িত্ব পালনকারী হিসেবে
মাস্ক এবং ইয়াক্কারিনোকে স্বেচ্ছায় সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়েছে।
প্রসিকিউটরদের লক্ষ্য, এক্স প্ল্যাটফর্ম যাতে ফরাসি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে তা
নিশ্চিত করা এবং অভিযুক্তদের কাছ থেকে তাদের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা
পাওয়া। তবে মাস্ক বা ইয়াক্কারিনো এই শুনানিতে সশরীরে উপস্থিত হবেন কিনা, তা এখনো
নিশ্চিত নয়।
এদিকে, এই তদন্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। ফরাসি
প্রসিকিউটররা মার্কিন বিচার বিভাগ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছে
সতর্কবার্তা পাঠিয়েছেন।
তাদের দাবি, এক্স ও এক্সএআইর বাজারমূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে
বিতর্কিত কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে, যা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। তবে মার্কিন বিচার
বিভাগ ফরাসি কর্তৃপক্ষের এই তদন্তে সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মার্কিন বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, ফ্রান্স তার
ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে মার্কিন ব্যবসার ক্ষতি করতে এবং
বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করতে চাইছে।
সংকট এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ বা
আরএসএফ এক্স প্ল্যাটফর্মে ভুল তথ্য বা ডিজইনফরমেশন ছড়ানোর বিরুদ্ধে পৃথক একটি
মামলা করেছে।
আরএসএফে’র মতে, এক্স প্ল্যাটফর্ম ডিজইনফরমেশনের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে, যার মধ্যে কিছু
পোস্ট কয়েক লাখ ভিউ পেয়েছে। যদিও এলন মাস্কের প্ল্যাটফর্মের কর্মীরা বিষয়টি
সম্পর্কে অবগত, তবুও তারা আরএসএফের বারবার করা সতর্কবার্তাগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে
প্রত্যাখ্যান করছে। এটি এক্সের একটি ইচ্ছাকৃত নীতি, যা নির্ভরযোগ্য তথ্যের অধিকারের
সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তাদের অভিযোগ, প্ল্যাটফর্মটি নির্ভরযোগ্য তথ্যের অধিকার বারবার লঙ্ঘন করছে এবং
বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধে বারবার আসা সতর্কবার্তাগুলোকেও ইচ্ছেকৃতভাবে
উপেক্ষা করছে।
সব মিলিয়ে, ইলন মাস্কের এই প্ল্যাটফর্মটি এখন একদিকে ফরাসি আইনি ব্যবস্থার কঠোর
চাপের মুখে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কে জড়িয়েছে।





