শুক্রবার, ২৪শে এপ্রিল, ২০২৬, ১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩

৩০ বছর পর ফিরলেন বাড়ি, আবেগ আপ্লুত পরিবার

আমির হোসেন-রোকেয়া বেগম দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা

ফেরাতে শিশুসন্তানদের স্ত্রীর কাছে রেখে আমির হোসেন পাড়ি জমান মালয়েশিয়ায়।

প্রথম তিন বছর যোগাযোগ থাকলেও পরে ২৭ বছর ধরে ছিলেন নিখোঁজ। পরিবারের সদস্যরা কোনো

খবর পাচ্ছিলেন না। ছয় মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও দেখে রোকেয়া

শনাক্ত করেন, এটি তার স্বামীর ছবি। এরপর ভিডিও পোস্ট করা ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ

করে আমির হোসেনের পরিবার। দীর্ঘ ছয় মাসের প্রচেষ্টার পর গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল)

গভীর রাতে আমির হোসেন পা রাখেন বাংলাদেশের মাটিতে। ৩০ বছর পর আমির হোসেনকে কাছে

পেয়ে তার স্ত্রী ও সন্তানরা আপ্লুত হয়ে পড়েছেন।

আমির হোসেনের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা ইউনিয়নের দিনারা গ্রামে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, স্ত্রী ও ছয় সন্তান নিয়ে আমির হোসেনের সংসার। অভাব–অনটন

লেগেই থাকত। সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে পারিবারিকভাবে পাওয়া কৃষিজমি বিক্রি করে ১৯৯৬

সালে দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান আমির হোসেন। সেখানে গিয়ে

রংমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। মালয়েশিয়া যাওয়ার পর তিন বছর পরিবারের সঙ্গে তার

যোগাযোগ ছিল। সংসার খরচের টাকাও পাঠাতেন প্রতি মাসে। তিন বছর পর হঠাৎ করেই পরিবারের

সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরাও তার কোনো সন্ধান পাচ্ছিল না।

আমির হোসেন কোথায়, কীভাবে আছেন, আদৌ বেঁচে আছেন কি না; তাও জানতেন না পরিবারের

সদস্যরা।

ছয় মাস আগে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের একটি জঙ্গলে গিয়ে একটা ছোট্ট টিনের ঘরে মানসিক

ভারসাম্যহীন অবস্থায় আমির হোসেনকে দেখতে পান দীপু নামের এক প্রবাসী এবং প্রবাসী

সংবাদকর্মী বাপ্পি কুমার দাস। সেখান থেকে তারা তাকে উদ্ধার করে সামাজিক

যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন। ওই ভিডিও দেখে আমির হোসেনকে তার পরিবারের

সদস্যরা শনাক্ত করেন। এরপর তারা ভিডিও পোস্টকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের

মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা ভিডিও কলে আমির হোসেনের সঙ্গে কয়েক দফা কথা বলেন। এরপর

তাকে দেশে ফেরানোর জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা আমির হোসেনের ছবি ও তার দেওয়া তথ্য

পাঠায় নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে। তার মাধ্যমে তথ্য যাচাই

করা হয়। এরপর উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় চামটা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমির হোসেনের

জন্মনিবন্ধন করা হয়। ওই জন্মনিবন্ধন ও পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন ডকুমেন্ট পাঠানো

হয় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসে। এরপর তাকে সেখান থেকে ট্রাভেল পাস প্রদান করে

দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে। গত মঙ্গলবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে মালয়েশিয়া থেকে ঢাকায়

পৌঁছান তিনি।

বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) ও প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের সহায়তায়

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও পরিবারের সদস্যরা আমির হোসেনকে গ্রহণ করে‌ন।

বিমানবন্দরের কার্যক্রম শেষ করে পরিবারের সদস্যরা আমির হোসেনকে নিয়ে যান ঢাকার

কেরানীগঞ্জে তার ছোট ছেলে শহীদুল ইসলামের বাসায়। সেখানে তিনি বর্তমানে বিশ্রামে

রয়েছেন।

দীর্ঘ ৩০ বছর পর স্বামী ফিরছেন, এমন খবর পেয়ে ঢাকায় ছেলেদের কাছে ছুটে যান

রোকেয়া বেগম। বিমানবন্দরে স্বামীকে কাছে পেয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

রোকেয়া বেগম বলেন, ‘ছয় শিশুসন্তান রেখে তিনি (আমির হোসেন) মালয়েশিয়ায় যান। তিন

বছর পর্যন্ত প্রতি মাসে কমবেশি টাকা পাঠিয়েছেন সংসার খরচের জন্য। হঠাৎ করে তিনি

যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। ২৭ বছর ধরে তাকে বিভিন্নভাবে খোঁজার চেষ্টা করেছি। কোনো

সন্ধান পাচ্ছিলাম না। মানুষটা বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন, তাও বুঝতে পারছিলাম না।

ছোট ছোট ছেলে–মেয়েদের নিয়ে বিপাকে পড়ে যাই। আত্মীয়-স্বজন ও এলাকার মানুষের

সহায়তায় খেয়ে না–খেয়ে ছেলে–মেয়েদের নিয়ে বেঁচে ছিলাম। ছয় মাস আগে আমার এক

ভাই মোবাইলে একটি ভিডিও দেখান, ওই ভিডিও দেখে আমরা তাকে চিনতে পারি। এরপর তাকে ফিরে

পাওয়ার জন্য আমাদের আকুতি বেড়ে যায়। আমার সন্তানরা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে

তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। এভাবে ফেসবুকে একটি ভিডিও দেখে তাকে ফিরে পাব,

তা কখনো ভাবতে পারিনি। স্বামীকে এত বছর পর ফিরে পাওয়া আমার জীবনের একটি

অবিস্মরণীয় ঘটনা।

আমির হোসেনের তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে তিন বছর আগে মারা গেছেন। তিন

মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, তারা শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। আর বেঁচে থাকা দুই ছেলে ঢাকায়

শ্রমিকের কাজ করেন। তারা ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায় ভাড়া করা একটি বাসায় থাকেন।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান জানান, ৩০

বছর ধরে একজন প্রবাসে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ২৭ বছর ধরে যোগাযোগ না থাকার ঘটনা

ভীষণ বেদনাদায়ক। এমন একজনকে পরিবার খুঁজে পেতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা গুরুত্বপূর্ণ

ভূমিকা রাখলেন। এই ফিরে আসা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, একটি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার

সমাপ্তি।

শরিফুল হাসান বলেন, ‘এই ঘটনা প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। একজন

মানসিক ভারসাম্যহী; কিন্তু কেউ তার খোঁজ জানেন না। অতীতেও আমরা এমন ঘটনা দেখেছি।

এমন সংকটে আরও কতজন আছেন, তাও আমরা জানি না‌। অথচ প্রত্যেক প্রবাসীর খোঁজ রাখা

জরুরি। এই প্রযুক্তির যুগে প্রত্যেক প্রবাসীর ডেটাবেজ করা অসম্ভব নয়, বরং জরুরি।

কারণ, তারা এই দেশের মানুষ এবং আমাদের অর্থনীতি সচল রাখেন।’

নড়িয়ার ইউএনও আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘আমরা ওই ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে

তথ্যগুলো যাচাই শেষে আবার মালয়েশিয়া দূতাবাসে পাঠিয়েছি। এখান থেকে তার কিছু

ডকুমেন্ট পাঠানোর পরে দূতাবাস থেকে তাকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনি দেশে

ফিরে এসেছেন, পরিবারের কাছে আছেন। ওই ব্যক্তির যেকোনো সমস্যায় উপজেলা প্রশাসন পাশে

থাকবে।’

পোস্টটি শেয়ার করুন