বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ সারিতে। আর এই বিশাল
পোশাক শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি হলো তুলা। টেক্সটাইল খাতের কাঁচামালের এই বিশাল
চাহিদাকে লক্ষ্য করে এবার নতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন
তুলা রপ্তানি বাড়াতে ওয়াশিংটনের নতুন পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে অন্যতম শীর্ষ ও কৌশলগত
বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসন চাচ্ছে,
বাংলাদেশ যেন তাদের তৈরি পোশাকে মার্কিন তুলা ও টেক্সটাইল কাঁচামাল ব্যবহার করে। আর
এর বিনিময়ে বাংলাদেশ পেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিশেষ শুল্ক সুবিধা বা
শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার।
সম্প্রতি মার্কিন কৃষি বিভাগ (USDA) দেশটির ঝিমিয়ে পড়া তুলা খাতকে চাঙা করতে ‘গ্রেট
আমেরিকান কটন প্ল্যান’ (Great American Cotton Plan) বা ‘মহান মার্কিন তুলা
পরিকল্পনা’ চালু করেছে। এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্যই হলো—বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার
মতো বৃহৎ তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশগুলোকে মার্কিন তুলা ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং
দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি আদায় করা।
এরই ধারাবাহিকতায়, গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি
দ্বিপক্ষীয় পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি সই হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু
বাংলাদেশি বস্ত্র ও পোশাকপণ্য শূন্য শুল্কে বা শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমেরিকার বাজারে
প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। তবে এই আকর্ষণীয় সুবিধার আড়ালে রয়েছে একটি বড় শর্ত।
বাংলাদেশ কতটা শুল্ক সুবিধা পাবে, তা সরাসরি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কী
পরিমাণ তুলা ও কৃত্রিম তন্তুর কাঁচামাল আমদানি করা হচ্ছে, তার ওপর। যদিও এই সুবিধার
সুনির্দিষ্ট সমীকরণ বা গাণিতিক ব্যাখ্যা এখনো ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা
হয়নি।
নীতিমালার ধোঁয়াশা ও ‘রুলস অব অরিজিন’: আমেরিকার এই প্রস্তাব বাংলাদেশের তৈরি পোশাক
খাতের জন্য যেমন বড় সম্ভাবনার, তেমনি এর পেছনে রয়েছে কিছু নীতিগত জটিলতা। বাংলাদেশ
টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (BTMA) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এই বিষয়ে মার্কিন
কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় আলোচনা করেছেন। তার মতে, মার্কিন তুলার মান অত্যন্ত
চমৎকার এবং দেশের সুতা ও বস্ত্রকল মালিকরা মার্কিন সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আগের
চেয়ে বেশি তুলা কিনছেন। কিন্তু এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে প্রথম বড়
বাধা হলো ‘রুলস অব অরিজিন’ বা পণ্যের উৎপত্তি-সংক্রান্ত কঠোর শর্তাবলি।
শুল্ক ছাড়ের সুবিধা পেতে হলে একটি পোশাকে ঠিক কত শতাংশ মার্কিন তুলা বা কৃত্রিম
তন্তু থাকতে হবে, সে বিষয়ে মার্কিন নীতিমালায় এখনো স্পষ্ট কোনো রূপরেখা দেওয়া হয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সূত্র ধরে জানা গেছে, কম শুল্কের এই
সুবিধা হয়তো ঢালাওভাবে সব পোশাক রপ্তানির জন্য প্রযোজ্য হবে না। বরং এটি নির্দিষ্ট
একটি কোটা ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা বেশি। নীতিমালার এই ধোঁয়াশা না
কাটলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
লিড টাইম ও প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার লড়াই: নীতিগত জটিলতার পাশাপাশি দ্বিতীয়
বড় চ্যালেঞ্জটি হলো ভৌগোলিক দূরত্ব এবং ‘লিড টাইম’ বা পরিবহনে দীর্ঘ সময় লাগা।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রধান শক্তি হলো দ্রুত পণ্য সরবরাহ করা। ভারতের মতো
প্রতিবেশী দেশ বা মধ্য এশিয়া থেকে তুলা আমদানি করতে যেখানে সামান্য কিছু দিন সময়
লাগে, সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাহাজে করে তুলা বাংলাদেশে পৌঁছাতে ৪৫
দিনেরও বেশি সময় লেগে যায়।
তুলা আমদানিতে এই অতিরিক্ত সময় লাগার কারণে পোশাকের উৎপাদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে
পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বা
কম্পিটিটিভনেস কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এই বাস্তবমুখী সমস্যা সমাধানের জন্য
বিটিএমএ-র পক্ষ থেকে একটি চমৎকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তারা বাংলাদেশে মার্কিন
তুলা সংরক্ষণের জন্য বিশেষ বন্ডেড গুদাম বা ‘তুলা ব্যাংক’ সুবিধা তৈরির দাবি
জানিয়েছেন। দেশে মার্কিন তুলার পর্যাপ্ত স্টক থাকলে আমদানিকারকরা তাৎক্ষণিকভাবে
কাঁচামাল কিনতে পারবেন এবং ৪৫ দিনের দীর্ঘ লিড টাইম ১০ থেকে ১৫ দিনে নামিয়ে আনা
সম্ভব হবে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও আগামী সপ্তাহের বৈঠক: এই চুক্তি এবং এর শর্তাবলীকে বাংলাদেশের
পোশাক খাতের অনুকূলে নিয়ে আসতে দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের
(BGMEA) পরিচালক ফয়সল সামাদ জানিয়েছেন, মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি
পোশাকের ক্ষেত্রে ‘রুলস অব অরিজিন’-এর শর্তগুলো কী হবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা
হবে, তা নিয়ে আগামী সপ্তাহেই ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে
একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করবে বিজিএমইএ। এর আগে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের
(USTR) সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও, তারা জানিয়েছিলেন যে নীতিমালাটি
এখনো চূড়ান্তকরণের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ফলে আগামী সপ্তাহের বৈঠকটিকে অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্য ঘাটতি ও দুই দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সমীকরণ; যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক
আগ্রহের পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ। বর্তমানে বাংলাদেশের বার্ষিক
তুলার বাজার প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র
থেকে। বাকি বড় অংশটি আসে অন্যান্য দেশ থেকে। মার্কিন প্রশাসন চাচ্ছে এই ৯ শতাংশের
কোটা দ্রুত বাড়িয়ে তাদের নিজেদের তুলা চাষি
ও টেক্সটাইল কাঁচামাল উৎপাদনকারীদের বড় অঙ্কের মুনাফা এনে দিতে।
এর পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো দুই দেশের মধ্যকার বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি। পরিসংখ্যানে
দেখা যাচ্ছে:
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য: চলতি ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মোট পণ্য
বাণিজ্য প্রায় ১১.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
আমদানি-রপ্তানি চিত্র: ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে
রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯.৫ বিলিয়ন ডলারে (যার ৮৬ শতাংশই তৈরি পোশাক)। এর
বিপরীতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে মাত্র ২.৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
বাণিজ্য ঘাটতি: এর ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.১ বিলিয়ন ডলারে,
যা আগের বছরের তুলনায় ১৭.৯ শতাংশ বেশি।
আমেরিকা মূলত এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বাংলাদেশকে দিয়ে তাদের তুলা কেনাতে
চায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্রেট আমেরিকান কটন প্ল্যান’ বাংলাদেশের জন্য একটি দ্বিধারী
তলোয়ারের মতো। একদিকে মার্কিন বাজারে তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের
হাতছানি, যা আমাদের রপ্তানি আয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে মার্কিন তুলা
আমদানির বাধ্যবাধকতা, রুলস অব অরিজিনের কঠিন শর্ত এবং ৪৫ দিনের দীর্ঘ লিড টাইমের
ঝুঁকি।
বাংলাদেশ যদি কূটনৈতিক চাতুর্য ও দক্ষ আলোচনার মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের কাছ থেকে
সহজ শর্তে ‘রুলস অব অরিজিন’ আদায় করতে পারে এবং দেশের মাটিতে মার্কিন তুলার নিজস্ব
গুদাম সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে, তবে এই চুক্তি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে
একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। অন্যথায়, শর্তের বেড়াজালে পড়ে শুল্ক সুবিধা অধরাই থেকে
যেতে পারে। তাই আগামী দিনে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সাথে বিজিএমইএ এবং সরকারি
পর্যায়ের আলোচনাটিই নির্ধারণ করবে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ।





