মধ্যপ্রাচ্য বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুদ্ধ, সংঘাত আর অনিশ্চয়তার এক চিরচেনা
ছবি। কিন্তু এই অশান্তির দায় যতটা না ওখানকার সাধারণ মানুষের, তার চেয়ে অনেক বেশি
ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে থাকা কিছু ভুল সিদ্ধান্ত এবং পরাশক্তিদের ভূ-রাজনৈতিক
স্বার্থের। গত এক শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলে শান্তি ফেরানোর নামে যতগুলো বড় বড় চুক্তি
হয়েছে, সেগুলোর প্রায় প্রতিটিই কোনো না কোনোভাবে নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতে যা ছিল ‘শান্তির উদ্যোগ’, ভেতরের দিক থেকে তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই
ভূখণ্ডকে চূর্ণবিচূর্ণ করার সুনিপুণ হাতিয়ার।
ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০২৬ সালের জুনে এসে আজও এক চরম নাটকীয়তার
সাক্ষী হলো বিশ্ব। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে
শুক্রবার (১৯ জুন)যে বহুল প্রতীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা হওয়ার কথা
ছিল, তা শেষ মুহূর্তে আকস্মিকভাবে স্থগিত হয়ে গেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি
ভ্যান্সের সফর বাতিলের পর এই অচলাবস্থা তৈরি হয়, যা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শান্তিকে
এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে চার মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে এই
‘শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ’ কোন দিকে যাবে তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে পুরো লেবানন ছারখার করে দেওয়ার উগ্র হুংকার—সব মিলিয়ে
মধ্যপ্রাচ্য আবার এক নতুন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানে গত বুধবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা
স্বারক সই হলেও লেবাননে ইসরায়েলের হামলা হয়েছে।
শুক্রবার (১৯ জুন)লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া
কয়েকজন আহত ও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা (এনএনএ)।
খবর-আলজাজিরার।
এনএনএ জানায়, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর শুরু হওয়া এই হামলা সাম্প্রতিক সময়ে
এলাকাটিতে চালানো সবচেয়ে তীব্র ইসরায়েলি আক্রমণগুলোর একটি। একাধিক আবাসিক বাড়ি
লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
অন্যদিকে, গত অক্টোবরে ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি সই হলেও গাজায় থামেনি ইসরায়েলি নৃশংসতা।
হামলায় নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনসের গাজা পরিচালক ফিকর শালতুত বলেন, গাজা আরও একটি
মর্মান্তিক মাইলফলকে পৌঁছানোয় আমরা শোকাহত। যে হাজার হাজার মানুষকে বলা হয়েছিল
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি শেষ হয়ে গেছে, তারা এখনো তাদের প্রিয়জনকে দাফন করছেন। এই
‘যুদ্ধবিরতি’ বড় ধরনের যুদ্ধ বন্ধ করলেও, চুক্তির দ্বিতীয় ও অত্যন্ত সংবেদনশীল
পর্যায়টি বাস্তবায়নের জন্য কোনো সমঝোতা হয়নি। এই পর্যায়ে গাজা থেকে ইসরায়েলি
সৈন্যদের প্রত্যাহার এবং হামাসের অস্ত্র সমর্পণের কথা ছিল।
অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তাদের উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে।
চুক্তির আওতায় গাজা উপত্যকার ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা
থাকলেও, বর্তমানে তারা ৬৪ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
জাতিসংঘ মানবিক বিষয়ক সমন্বয়কারী অফিস (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, পূর্ব গাজা সিটির
ডজনখানেক পরিবারকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। কারণ, ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে হলুদ
রঙের সিমেন্টের ব্লক স্থাপন করেছে, যা তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখাকে পশ্চিম
দিকে আরও সম্প্রসারিত করার ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে, ইসরায়েল ও ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ একটি
যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ
যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনার মাধ্যমে
এই চুক্তি চূড়ান্ত করেছে, যেখানে সহযোগিতা করেছে ইরান।
এসব আলোচনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই করা ইরান চুক্তি
(সমঝোতা স্মারক) মেনে নেওয়ার জন্য ইসরায়েল সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।
একই সঙ্গে জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দিয়েছেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল
বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রই
তাদের একমাত্র শক্তিশালী মিত্র হিসেবে অবশিষ্ট আছে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক ব্রিফিংয়ের শেষভাগে
ভ্যান্স বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার সদস্য হতাম, তবে পুরো বিশ্বে আমার
একমাত্র যে শক্তিশালী মিত্রটি টিকে আছে, অন্তত তাকে আক্রমণ করতাম না।’
জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দেন যে ইসরায়েলের ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা অস্ত্রের
তিন-চতুর্থাংশই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এবং এর খরচও তারাই জুগিয়েছে। ফলে ইসরায়েলের
সমস্যাটি ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প নন’।
কলমের খোঁচায় কৃত্রিম ক্ষত, ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি: মধ্যপ্রাচ্যের আজকের যত
সীমান্ত বিরোধ ও জাতিগত সংঘাত, তার সিংহভাগের শুরু হয়েছিল মূলত পশ্চিমা
পরাশক্তিদের নিজেদের স্বার্থ, আধিপত্য এবং তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার আদিম
খেলায়।
সাইকস-পিকট চুক্তি (১৯১৬): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন ও ফ্রান্স অত্যন্ত
গোপনে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে আরবের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজেদের মধ্যে ভাগ করে
নেয়। স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি বা জাতিগত পরিচয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শিয়া,
সুন্নি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়গুলোকে জোর করে কৃত্রিম সীমান্তের ভেতর আটকে দেওয়া
হয়। ফলে সিরিয়া ও ইরাকে স্থায়ী অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৈরি হয়। অন্যদিকে, বিশ্বের
অন্যতম বড় জাতিগোষ্ঠী ‘কুর্দি’দের কোনো নিজস্ব রাষ্ট্র না দিয়ে তাদের সীমানা ভেঙে
চার টুকরো করে দেওয়া হয়।
বেলফোর ঘোষণা (১৯১৭): ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর ফিলিস্তিনিদের
নিজেদের ভূমিতে ইহুদিদের জন্য ‘জাতীয় আবাসভূমি’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। শতভাগ
ফিলিস্তিনি আরবদের মতামত না নিয়ে চাপিয়ে দেওয়া এই সিদ্ধান্তের সূত্র ধরেই ১৯৪৮
সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং লাখ লাখ ফিলিস্তিনি নিজ ভূখণ্ড হারিয়ে
শরণার্থী হন।
ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি (১৯৭৮) ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস (২০২০): ১৯৭৮ সালে মিসর এবং ২০২০
সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কোর মতো দেশগুলো ফিলিস্তিন সংকটকে পাশ
কাটিয়ে ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পশ্চিমা বিশ্বের চোখে এটি
সাফল্য হলেও, এর ফলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরব বিশ্বের সম্মিলিত ঐক্য ভেঙে যায় এবং
ফিলিস্তিনিরা চরমভাবে একাকী ও অসহায় হয়ে পড়ে।
অসলো চুক্তি (১৯৯৩): ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী
আইজাক রাবিনের ঐতিহাসিক চুক্তি বিশ্বকে ‘দুই-রাষ্ট্র সমাধান’-এর স্বপ্ন দেখালেও
বাস্তবে তা ফিলিস্তিনকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেয়নি। উল্টো ফিলিস্তিনকে অঞ্চল ‘এ’
(ইসরায়েলি সামরিক বেষ্টনীতে ঘেরা মূল শহর), অঞ্চল ‘বি’ (যৌথ নিয়ন্ত্রণ) এবং অঞ্চল
‘সি’ (পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশ এলাকা যা সম্পূর্ণ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে এবং যেখানে
অবৈধ ইহুদি বসতি গড়া হচ্ছে)—এই তিন ভাগে ভাগ করে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।
শেষ মুহূর্তে থমকে গেল আলোচনা: ইতিহাসের সেই কৃত্রিম সংকটের জের ধরে গত ২৮
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান
হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে এক বিধ্বংসী সংঘাত শুরু হয়। চার মাসের এই
যুদ্ধে ইতোমধ্যে অন্তত ৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের
দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
এই যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে আয়োজিত বৈঠকটি স্থগিত
হওয়ার পর হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ‘এ আলোচনার সার্বিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা
কখনোই সহজ ছিল না।’ সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ
না জানালেও, ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, ইরান কঠোর শর্ত
দিয়েছিল যে আলোচনার টেবিলে বসার আগে অন্তর্বর্তী চুক্তি তথা ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি
বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও স্পষ্ট পদক্ষেপ দেখতে হবে।
‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ বনাম ট্রাম্পের হতাশা ও কৌশলগত পিছুটান: ইরান যুদ্ধ শুরুর
সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত কঠোর অবস্থান এবং তেহরানের
‘ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার’ হুংকার থেকে তিনি নাটকীয়ভাবে
পিছু হটেছেন বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। সম্প্রতি তেহরানের সঙ্গে
ওয়াশিংটনের সম্পাদিত ১৪ দফার প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের শুরুতে
ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যগুলোর প্রায় সব কটিই তিনি শিথিল করেছেন অথবা
পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন।
গত ৬ মার্চ ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত কড়া ভাষায় লিখেছিলেন,
‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে আর কোনো চুক্তি হবে না।’ কিন্তু বর্তমান
চুক্তির বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। চুক্তিতে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা
তোলা, প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি আটকে থাকা বৈশ্বিক সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং
৩ হাজার কোটি ডলারের পুনর্গঠন তহবিলের কথা বলা হয়েছে।
এই কারণে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই তীব্র ক্ষোভ
তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্প ইরানকে
অনেক বেশি ছাড় দিয়ে ফেলেছেন। অন্যদিকে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ
মোজতবা আলী খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প চরম ‘হতাশা’ থেকে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।
ট্রাম্পের যুদ্ধকালীন লক্ষ্য বনাম চুক্তির বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ: কূটনৈতিক
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ এড়াতে
মার্কিন প্রশাসন তেহরনাকে ব্যাপক নীতিগত ও কৌশলগত ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংসের হুমকি: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দিন ডোনাল্ড
ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করব এবং ক্ষেপণাস্ত্র
শিল্পকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেব। এটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’ তবে গত
বুধবার ফ্রান্সে জি৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পকে একেবারে ভিন্ন
সুরে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের কাছে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র থাকা
স্বাভাবিক। ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের কাছে কিছু থাকতেই হবে। কারণ, অন্যদের কাছেও তা
রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র কোনো সমস্যা নয়। কারণ, এগুলো পুরো পৃথিবী ধ্বংস করে দেয়
না।’ বর্তমান সমঝোতা স্মারকে ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে কোনো উল্লেখই নেই, যা ইরানের
একটি বড় কৌশলগত বিজয়।
রেজিম পরিবর্তন বা শাসনব্যবস্থা বদল: যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনগুলোতে ট্রাম্প ইরানের
জনগণকে তাদের সরকার পতনের ডাক দিয়েছিলেন। পরে ইরানিদের পক্ষ থেকে এমন কোনো
গণঅভ্যুত্থানের লক্ষণ না পাওয়ায় হোয়াইট হাউস এই অবস্থান থেকে সরে আসে। যদিও
মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার ঘটনাকে
ট্রাম্প প্রশাসন একধরনের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ হিসেবে দাবি করতে চেয়েছিল,
কিন্তু ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক নেতার ছেলে
মোজতবা খামেনি, যা তেহরানের শাসনকাঠামোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। গত বুধবার
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ‘আমি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য এটি করিনি।’
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও মজুত জব্দ: গত এপ্রিল মাসেও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘ইরানের
কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সহ্য করা হবে না।’ তবে বর্তমানে ট্রাম্প বেসামরিক
বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কাজের জন্য ইরানকে স্বল্পমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের
সুযোগ দিতে সম্মতি জানিয়েছেন। একইভাবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত প্রসঙ্গে
মার্কিন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী সেই মজুত আইএইএর
(IAEA) তত্ত্বাবধানে ইরানের মাটিতেই নিষ্ক্রিয় বা মিশ্রিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া
হয়েছে।
প্রক্সি গোষ্ঠী ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ: মার্কিন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান
লক্ষ্য ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনের হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে
ইরানের অর্থায়ন চিরতরে বন্ধ করা। কিন্তু বর্তমান সমঝোতা স্মারকে ইরানের আঞ্চলিক
প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধের বিষয়ে সরাসরি কোনো আইনি বাধ্যবাকতা রাখা
হয়নি। অন্যদিকে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ‘স্থায়ীভাবে
টোলমুক্ত’ রাখার দাবি জানালেও, চুক্তিতে মাত্র ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে
নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সার্বভৌম
অধিকার রয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবেই আমরা পরিষেবার জন্য ফি আদায় করব।’
লেবাননে ইসরায়েলের উগ্র অবস্থান ও মার্কিন-ইসরায়েল ফাটল: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের
মধ্যে এই শান্তি আলোচনা ও চুক্তি নিয়ে যখন তীব্র টানাপোড়েন চলছে, তখন এই
প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বাদ পড়া ইসরায়েল নিজেদের এই চুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে
রেখেছে। তারা লেবাননে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক
অভিযান এবং বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। লেবাননে ইসরায়েলের নতুন বিমান হামলায়
অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন এবং যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষ
বাষ্টুচ্যুত হয়েছেন। চুক্তিতে লেবাননে যুদ্ধের ‘স্থায়ী অবসান’–এর কথা বলা হলেও
ইসরায়েল সাফ জানিয়েছে, সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই;
উল্টো তারা দখলকৃত অঞ্চলের পরিধি বাড়াতে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এই নিয়ে
ট্রাম্প এখন প্রকাশ্যেই ইসরায়েলের সমালোচনা শুরু করায় গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশ
দুটির সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ফাটল তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর হামলায় ৪ ইসরায়েলি
সেনা নিহত হন, যার মধ্যে ছিলেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ৪১ নম্বর ব্রিগেডের
অধীনস্থ ৫২ নম্বর ব্যাটালিয়নের কমান্ডার ৩২ বছর বয়সি লেফটেন্যান্ট ডর গেদালিয়া
বেন সিমহন। এই ঘটনার পরপরই চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েন ইসরায়েলের অতি ডানপন্থী
নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভির। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার)
দেওয়া এক পোস্টে তিনি পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেন, আমেরিকানদের
প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই বলছি, ইসরায়েলকে পুরো বিশ্বের কাছে এটি স্পষ্ট করে দিতে
হবে—আমাদের সন্তানদের রক্ত এবং আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা কোনো হেলাফেলার বস্তু
নয়। পুরো লেবানন পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। একজন ইসরায়েলি মায়ের প্রতি ফোঁটা চোখের
জলের বদলে এক হাজার লেবাননি মাকে কাঁদতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলে টিকে
থাকতে হলে ‘উন্মাদের মতো আচরণ করতে হবে, সবকিছু নিশ্চিহ্ন ও গুঁড়িয়ে দিতে হবে’।
ইতিহাস এবং বর্তমানের এই দুই চিত্র মেলালে একটি সত্যই বারবার সামনে
আসে—মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার নামে যতবার স্থানীয় মানুষের আবেগ, অধিকার ও ঐতিহাসিক
ন্যায়বিচারকে পাশ কাটিয়ে পরাশক্তিদের স্বার্থে কোনো চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া
হয়েছে, ততবারই তা নতুন কোনো যুদ্ধের জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে।
আজ ২০২৬ সালের জুনে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিন ও লেবাননের মূল সংকটকে আড়ালে রেখে এবং
ইসরায়েলকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে মার্কিন-ইরান যে শান্তিপ্রক্রিয়া সাজানো
হয়েছিল, তা শুরুতেই থমকে যাওয়া প্রমাণ করে এর ভবিষ্যৎ কতটা অন্ধকার। কারণ, যতক্ষণ
না বাহ্যিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এই অঞ্চলের মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা ও ভূখণ্ড
নিশ্চিত করা হচ্ছে, ততক্ষণ শান্তির মোড়কে তৈরি এই ভঙ্গুর চুক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যকে
আরও দীর্ঘকাল ধরে চূর্ণবিচূর্ণ করতেই থাকবে। পরাশক্তিদের পিছুটান এবং আঞ্চলিক
শক্তিগুলোর অনড় অবস্থান এটাই স্পষ্ট করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির সূর্য
এখনো বহু দূরে।





