দেশের লজিস্টিকস ও বন্দর খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়াতে ইনল্যান্ড
কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) ও অফ-ডক পরিচালনায় বিদেশি মালিকানার ওপর থাকা দীর্ঘদিনের
বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করেছে সরকার। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই
গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে। এই
সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা এখন থেকে দেশীয় কোনো অংশীদার ছাড়াই
এককভাবে বা শতভাগ মালিকানায় আইসিডি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করার সুযোগ পাবেন।
এতদিন বিদেশি অপারেটরদের জন্য বাংলাদেশে লজিস্টিকস ব্যবসায় প্রবেশের ক্ষেত্রে
স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ বা জয়েন্ট ভেঞ্চার গঠন করা বাধ্যতামূলক ছিল
এবং মালিকানার বড় অংশ স্থানীয়দের হাতে রাখা জরুরি ছিল। আগামী বছরগুলোতে দেশের
রপ্তানি বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ার যে
সম্ভাবনা রয়েছে, সেই চাহিদা মেটাতে লজিস্টিকস অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক
করার লক্ষ্যেই সরকার এই বড় নীতিগত পরিবর্তন এনেছে। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক
লজিস্টিকস অপারেটরদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে ২৪টি আইসিডি পরিচালিত হচ্ছে এবং আরও অন্তত তিনটি
বড় আইসিডি নির্মাণাধীন অবস্থায় রয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ড, মেডলগ, রেড সি গেটওয়ে
টার্মিনাল, এপিএম টার্মিনালস এবং পিএসএ সিঙ্গাপুরের মতো বিশ্বখ্যাত লজিস্টিকস ও
বন্দর অপারেটররা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের এই খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ
দেখিয়েছে। সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এই বৃহৎ কোম্পানিগুলো এখন স্বাধীনভাবে
তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে, যা দেশের লজিস্টিক শিল্পে নতুন
প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি অপারেটরদের সরাসরি অংশগ্রহণ দেশের লজিস্টিক খাতে আধুনিক
প্রযুক্তি, উন্নত ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা দক্ষতার সমাহার ঘটাবে।
এতে পণ্য খালাস ও পরিবহনের গতি যেমন বাড়বে, তেমনি স্থানীয় কর্মীদের জন্য উন্নত
প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে বিনিয়োগের এই অপার সম্ভাবনাকে
বাস্তব রূপ দিতে হলে কেবল মালিকানার সীমা তোলাই যথেষ্ট নয়; বরং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ
সরবরাহ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং শুল্ক নির্ধারণ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা
অত্যন্ত প্রয়োজন। এছাড়া বন্দরের পরিচালনাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের ম্যানুয়াল
পদ্ধতির পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করাকেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে
দেখা হচ্ছে।
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে থাকা বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি সক্ষমতা
বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য-সহায়ক আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা, বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে লজিস্টিকস সেবার মান
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান
আরও সুদৃঢ় হবে। নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ বজায় থাকলে এই
সংস্কার দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে বড় সুফল বয়ে আনবে।





