ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্য বয়স যে শুধুই একটি সাধারণ সংখ্যা, তার প্রমাণ তিনি
আবারও দিলেন টেক্সাসের হিউস্টন স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায়। যখন বিশ্বজুড়ে সমালোচকরা
তাঁর অবসরের প্রহর গুনছিলেন, ঠিক তখনই ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা ভস্ম থেকে জেগে
উঠলেন এক অপরাজেয় ফিনিক্সের মতো। মঙ্গলবার উজবেকিস্তানের বিপক্ষে পর্তুগালের ৫-০
গোলের বিশাল জয়ের রাতে রোনালদো কেবল গোলই করেননি, বরং ফুটবল ইতিহাসের পাতায় খোদাই
করেছেন নতুন এক রাজকীয় অধ্যায়।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ব্রডকাস্টিং ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে এই পর্তুগিজ মহাতারকা
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ভক্তের উদ্দেশে স্বভাবসুলভ দম্ভ আর দাপটের সঙ্গে
বললেন, “আমি ফিরে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি।” তাঁর এই ঘোষণায় যেন মিশে ছিল চারদিক থেকে
ধেয়ে আসা সব সমালোচনার মোক্ষম জবাব। উল্লেখ্য যে, চলতি বিশ্বকাপে ডিআর কঙ্গোর
বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ছন্দহীন পারফরম্যান্সের কারণে ফুটবল মহলে তাঁকে ‘দলের বোঝা’
হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। এমনকি শুরুর একাদশে তাঁর জায়গা পাওয়া নিয়েও কড়া প্রশ্ন
তুলেছিলেন বিশ্লেষকরা। তবে হিউস্টনে রোনালদো যেন অপেক্ষায় ছিলেন সব প্রশ্নের উত্তর
দেওয়ার জন্য।
ম্যাচের মাত্র ৬ষ্ঠ মিনিটে সমালোচনার সব জাল ছিন্ন করে উৎসবের সূচনা করেন
সিআরসেভেন। হোয়াও কানসেলোর নিখুঁত ক্রস থেকে চমৎকার এক ভলিতে গোল করে তিনি ফুটবল
ইতিহাসের প্রথম পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন ৬টি বিশ্বকাপে গোল করার
অবিস্মরণীয় বিশ্বরেকর্ড গড়েন। এই অনন্য রেকর্ড গড়ার পথে তিনি পেছনে ফেলেছেন
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসিকে, যিনি ৫টি বিশ্বকাপে গোল করেছিলেন। এখানেই শেষ নয়,
৩৯তম মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের বুদ্ধিদীপ্ত পাস থেকে নিজের দ্বিতীয় ও দলের তৃতীয়
গোলটি করে পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে কিংবদন্তি ইউসেবিওকে (৯
গোল) ছাড়িয়ে যান তিনি। বিশ্বকাপে এখন রোনালদোর মোট গোল ১০টি।
রোনালদোর এই প্রত্যাবর্তন ছিল হার না মানা এক মানসিকতার প্রতিফলন। ৪১ বছর ১৩৮ দিন
বয়সে এই জোড়া গোল করে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে এক
ম্যাচে জোড়া গোলের বিশ্বরেকর্ডটিও নিজের করে নিলেন। মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে অস্ট্রিয়ার
বিপক্ষে ৩৮ বছর বয়সে জোড়া গোল করে লিওনেল মেসি যে রেকর্ড গড়েছিলেন, পর্তুগিজ
মহাতারকা তা মুহূর্তের মধ্যেই ভেঙে দিলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে রেকর্ড ১৪৫টি গোলের
মালিক এই কিংবদন্তি এখন ক্যারিয়ারের ১০০০ গোলের মাইলফলক থেকে মাত্র ২৫ কদম দূরে
দাঁড়িয়ে।
পর্তুগালের বড় জয়ের পর তৃপ্ত রোনালদো বলেন, “এটা খুব আনন্দের, তবে সবচেয়ে বড় কথা
সমালোচনা পেছনে ফেলে দল জিতেছে এবং আমরা সঠিক কক্ষপথে আছি। আমাদের লক্ষ্য এখন অনেক
দূরে।” বর্তমানে ২ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে ‘কে’ গ্রুপের শীর্ষে অবস্থান করছে
পর্তুগাল। তাঁর এই অসামান্য পারফরম্যান্স নিয়ে ফুটবল বিশ্বে এখন প্রশংসার জোয়ার
বইছে। মানুষের মানবিক সামর্থ্য যেখানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, সেখান থেকেই যেন রোনালদোর
জয়যাত্রা শুরু হয়—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাফল্যের জন্য যাঁর আজীবনের তৃষ্ণা,
সেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আবারও প্রমাণ করলেন কেন তিনি বিশ্ব ফুটবলের অনন্য এক
নক্ষত্র।





