বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালের মেগা মঞ্চে দীর্ঘ ২৪ বছর পর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। আগামী বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই
(রাত-১টায়) যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার ঐতিহ্যবাহী মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে
অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটিকে ঘিরে ফুটবলবিশ্বে টানটান উত্তেজনা
বিরাজ করছে। মাঠের লড়াই ছাড়িয়ে দুই দেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও ফুটবল বৈরিতার কারণে
পুরো আটলান্টা শহরজুড়ে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে স্থানীয় পুলিশ বিভাগ
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ম্যাচ মানেই কেবল ফুটবল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস,
রাজনীতি আর আবেগের চরম বিস্ফোরণ। ১৯৮২ সালের রক্তক্ষয়ী ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’
(আর্জেন্টাইনদের কাছে যা মালভিনাস নামে পরিচিত) দুই দেশের সম্পর্কে যে সংবেদনশীল
ক্ষত তৈরি করেছিল, তা ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ঐতিহাসিক
‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘শতাব্দীর সেরা গোল’-এর মাধ্যমে ফুটবল মাঠে এক অন্যরকম রূপ
নেয়। সেই থেকে এই দুই পরাশক্তির লড়াই মানেই মাঠ ও মাঠের বাইরে এক বারুদ ঠাসা আবহ।
বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডকে কোন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দিল? এক প্রজন্ম থেকে
আরেক প্রজন্মে যে ফুটবলীয় বৈরিতা চলে আসছে এ দুদেশের মধ্যে, সেই ঝাঁজালো
প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবার দেখবে ফুটবলবিশ্ব। লিওনেল মেসি সমাপ্তিরেখায় পৌঁছে যাওয়া
তার ক্যারিয়ারে এই প্রথম খেলবেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। আর ইংল্যান্ড? দীর্ঘ ৬০ বছর
ধরে যে ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে তারা, তার প্রতিষেধক খোঁজার আশায় আটলান্টায় ঝাঁপাবে।
১৯৬২ বিশ্বকাপে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার শুরু। এরপর ইউরোপ ও লাতিন ফুটবলের দুই
পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখেছে সুন্দর নিষ্ঠুর ফুটবল, নান্দনিক গোল, লাল কার্ড
এবং অতিঅবশ্যই ‘হ্যান্ড অব গড’। এই দ্বৈরথ শুধু সবুজ গালিচায় আটকে থাকেনি। দুদেশের
মধ্যে রাজনৈতিক বৈরিতা, বিশেষ করে আশির দশকে ফকল্যান্ড যুদ্ধ নিয়ে স্নায়ুক্ষয়ী
উত্তেজনা আজও আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মানুষ ভুলতে পারেনি। ফুটবলেও সেই ভূরাজনীতি
উত্তেজনা ছায়া ফেলে। ২০০২ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে শেষবার মুখোমুখি হয়েছিল এই দুদল।
ওই ম্যাচে ইংল্যান্ড জিতেছিল ৩-১ গোলে। ২৪ বছর পর আবার বিশ্বকাপে দেখা হচ্ছে ববি
চার্লটন ও দিয়েগো ম্যারাডোনার দেশের।
ইতিহাসে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচের যত আলোচিত ঘটনা
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ফুটবল
বিশ্বের অন্যতম তীব্র এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাসে রয়েছে অসংখ্য নাটকীয় মুহূর্ত,
বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং স্মরণীয় ঘটনা। এমন এক মহারণের আগে আর্জেন্টিনা হারিয়েছে
তাদের সাবেক অধিনায়ক অ্যান্তোনিও রাত্তিনকে। কয়েক দিন আগেই ৮৯ বছর বয়সে না–ফেরার
দেশে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। আর তার বিদায়ের পরই বিশ্বকাপে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে দুই
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী।
সবশেষ ২০০৫ সালে একটি প্রীতি ম্যাচে দেখা হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের। সেই
ম্যাচে ৩-২ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল ইংল্যান্ড। তবে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে দুই দলের
শেষ লড়াই হয়েছিল ২০০২ বিশ্বকাপে। প্রায় ২৪ বছর পর আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি
হতে যাচ্ছে দল দুটি। সেই উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক এই দ্বৈরথের পাঁচটি বহুল আলোচিত
অধ্যায়।
হ্যান্ড অব গড-
১৯৬২ বিশ্বকাপে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার শুরু। এরপর ইউরোপ ও লাতিন ফুটবলের দুই
পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখেছে সুন্দর নিষ্ঠুর ফুটবল, নান্দনিক গোল, লাল কার্ড
এবং অতিঅবশ্যই ‘হ্যান্ড অব গড’। এই দ্বৈরথ শুধু সবুজ গালিচায় আটকে থাকেনি। দুদেশের
মধ্যে রাজনৈতিক বৈরিতা, বিশেষ করে আশির দশকে ফকল্যান্ড যুদ্ধ নিয়ে স্নায়ুক্ষয়ী
উত্তেজনা আজও আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মানুষ ভুলতে পারেনি। ফুটবলেও সেই ভূরাজনীতি
উত্তেজনা ছায়া ফেলে। ২০০২ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে শেষবার মুখোমুখি হয়েছিল এই দুদল।
ওই ম্যাচে ইংল্যান্ড জিতেছিল ৩-১ গোলে। ২৪ বছর পর আবার বিশ্বকাপে দেখা হচ্ছে ববি
চার্লটন ও দিয়েগো ম্যারাডোনার দেশের।
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দুই চিরবৈরী দেশের ফুটবল দ্বৈরথের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ১৯৮৬
বিশ্বকাপের কখনো না-ভোলা সেই কোয়ার্টার ফাইনাল। যে ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসে চিরসবুজ
হয়ে রয়েছে ‘হ্যান্ড অব গড’ এর সৌজন্যে। ফকল্যান্ড যুদ্ধে দুদেশ শক্তি ক্ষয় করার চার
বছর পর ’৮৬ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে আরেক যুদ্ধে তাদের দেখা। ফুটবল মাঠেও
বারুদের গন্ধ। রাজনৈতিক উত্তেজনা। যেন ১০ সপ্তাহের অঘোষিত ফকল্যান্ড যুদ্ধ ফিরে আসে
৯০ মিনিটের ফুটবলযুদ্ধে। মেক্সিকোর বিখ্যাত আজতেকা স্টেডিয়াম তখন রণক্ষেত্র! সেই
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের ছায়া পড়েছিল।
এরপর দুটি চিরস্মরণীয় মুহূর্ত। প্রথমটি, ম্যারাডোনার হাতে করা গোল। আর্জেন্টিনার ১০
নম্বর লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে গোল করলেন। ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটন বুঝতেই
পারলেন না। রেফারিরও দৃষ্টি এড়িয়ে যায় অবিশ্বাস্যভাবে। পরে ম্যারাডোনার ক্লাসিক
উক্তিও ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়, যখন তিনি বলেন, ‘ওটা আমার হাত ছিল না। ছিল ঈশ্বরের হাত।’
সেটা যদি হয় ম্যারাডোনার ‘পাপ’, তাহলে তার দ্বিতীয় গোল ‘প্রায়শ্চিত্ত’। বিশ্বকাপের
ইতিহাসে সর্বকালের সম্ভবত সেরা গোল উপহার দেন তিনি অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় এবং
নান্দনিক সৌকর্যে। যে গোল ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে তার অনুপম সৌন্দর্যের সৌজন্যে।
প্রায় মাঝমাঠ থেকে ইংল্যান্ডের অর্ধেক দলকে ড্রিবল করে নাচিয়ে ছেড়ে ম্যারাডোনা
শিলটনকে বোকা বানিয়ে বল জালে পাঠিয়ে তাক লাগিয়ে দেন ফুটবলবিশ্বকে। আর্জেন্টিনা লিড
নেয় ২-০ গোলে। ওই ম্যাচ ২-১ গোলে হেরে ইংল্যান্ড বিদায় নেয় বিশ্বকাপ থেকে। সেজন্য
তারা কোনোদিন ক্ষমা করতে পারেনি আর্জেন্টাইন ফুটবলের বরপুত্রকে। পরে ইংল্যান্ডের
ক্ষতে লবণ দিয়ে আর্জেন্টিনা ’৮৬ বিশ্বকাপ জিতেছিল ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে
হারিয়ে।
২০০৫ সালে ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল করার জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন শিলটনের কাছে।
ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক ম্যারাডোনাকে ক্ষমা করেননি।
রাত্তিনকে মাঠ ছাড়াতে নেমেছিল পুলিশ-
১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েম্বলিতে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। সেই ম্যাচে
জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রিটলিনের সিদ্ধান্তে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ পান আর্জেন্টিনার
অধিনায়ক অ্যান্তোনিও রাত্তিন। ভাষাগত সমস্যার কারণে সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা জানতে
দোভাষী চাইলেও তা মেলেনি। মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে প্রায় ১০ মিনিট খেলা বন্ধ
থাকে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ মাঠে নেমে তাকে বাইরে নিয়ে যায়।
তখনও ফুটবলে হলুদ বা লাল কার্ডের প্রচলন ছিল না। এই ঘটনাই পরবর্তীতে ফুটবলে কার্ড
ব্যবস্থার সূচনার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বার্তোনির ঘুষিতে ভেঙেছিল চেরির দাঁত-
১৯৭৭ সালে লা বোম্বোনেরায় অনুষ্ঠিত এক প্রীতি ম্যাচেও দুই দলের লড়াই উত্তপ্ত রূপ
নেয়। ম্যাচের শেষ দিকে ইংল্যান্ডের ট্রেভর চেরির কঠিন ট্যাকলের জবাবে আর্জেন্টিনার
ড্যানিয়েল বার্তোনি সরাসরি তার মুখে ঘুষি মারেন। এতে চেরির সামনের দুটি দাঁত ভেঙে
যায়।
পরে দুজনকেই লাল কার্ড দেখানো হয়। সেই ম্যাচে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে প্রথম
ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে লাল কার্ড দেখেছিলেন ট্রেভর চেরি।
পচেত্তিনোর ফাউল, বেকহ্যামের গোল-
২০০২ বিশ্বকাপে দুই দলের সর্বশেষ প্রতিযোগিতামূলক লড়াইয়েও বিতর্কের জন্ম হয়।
প্রথমার্ধের শেষদিকে আর্জেন্টিনার মরিসিও পচেত্তিনোর চ্যালেঞ্জে মাইকেল ওভেনকে ফাউল
করা হয়েছে বলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি পিয়েরলুইজি কোলিনা। সেই সুযোগ থেকে
ডেভিড বেকহ্যাম গোল করে ইংল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে জয় এনে দেন।
বহু বছর পর টটেনহ্যামের কোচ থাকাকালে পচেত্তিনো দাবি করেছিলেন, ওভেন আসলে ডাইভ
দিয়েছিলেন এবং তিনি তাকে স্পর্শই করেননি।
বেকহ্যামের লাল কার্ড-
১৯৯৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে দুই দলের আরেকটি স্মরণীয় ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। নির্ধারিত
সময়ে ২-২ সমতার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। এর আগে দ্বিতীয়ার্ধে দিয়েগো সিমিওনের
সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে লাথি মেরে লাল কার্ড দেখেন ডেভিড বেকহ্যাম।
১০ জনের ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত ম্যাচকে টাইব্রেকারে নিয়ে গেলেও সেখানে ৪-৩ ব্যবধানে
জয় পায় আর্জেন্টিনা। সেই হার ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক
স্মৃতি হয়ে আছে।
সেমিতে অপ্রতিরোধ্য আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ডের কী হাল
ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের ইতিহাসে কখনো হারেনি তিনবারের চ্যাম্পিয়ন
আর্জেন্টিনা। পাঁচবার সেমিফাইনাল খেলে প্রতিবারই জিতেছে তারা।
অন্যদিকে ইংল্যান্ড এখন পর্যন্ত মোট তিনবার সেমিফাইনালে উঠেছে। ১৯৬৬ সালের আগে মোট
চারবার বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় ইংল্যান্ড। এর মধ্যে দুইবার গ্রুপ পর্বে বাদ পড়ে
তারা।
১৯৬৬ বিশ্বকাপ- ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালের বাধা পেরিয়ে
সেমিফাইনালে উঠে পর্তুগালকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠে ইংল্যান্ড। শিরোপা
নির্ধারণী ম্যাচে পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ইংল্যান্ড।
১৯৯০ বিশ্বকাপ- দীর্ঘ দুই যুগ পর সেমিফাইনালে উঠে ইংল্যান্ড। কিন্তু পশ্চিম
জার্মানির বিপক্ষে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলের ব্যবধানে হেরে আসর থেকে বিদায় নেই
ইংল্যান্ড।
২০১৮ বিশ্বকাপ- দীর্ঘ ২৮ বছর পর ২০১৮ সালে সেমিফাইনালে সুযোগ পায় ইংল্যান্ড। কিন্তু
সেমিফাইনালে লুকা মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলের ব্যবধানে হেরে
টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় ইংল্যান্ড।
অতীতে তিনবার সেমিফাইনাল খেলে একবারই ফাইনালে উঠে শিরোপার জিতে নেয় ইংল্যান্ড। এবার
ফের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আছে হ্যারি কেইনরা।





