একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি, অগ্নিকাণ্ড আর প্রযুক্তিগত নানা জটিলতায় জর্জরিত হয়ে
সরকারের জন্য এক বিশাল লোকসানের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে হবিগঞ্জের মাধবপুরে দেশের
অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। ফলে আলোর এই প্রকল্পটি নিজেই
রয়েছে অন্ধকারে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের একাধিক ইউনিট আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকায় পূর্ণ ক্ষমতায়
বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে সরকারের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ
ইতোমধ্যেই ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রটির প্রধান দুটি ইউনিটের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায়
প্রতিদিন সরকারের সম্ভাব্য লোকসান হচ্ছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা। দীর্ঘ ছয় বছরের
অচলাবস্থা, উৎপাদন ঘাটতি এবং বারবার মেরামতের খরচের কারণে এই ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন
বেড়েই চলেছে।
১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের অচলাবস্থা ও ৪ হাজার কোটির ক্ষতি ২০১৭ সালে প্রায় ৮৯০ কোটি
টাকা ব্যয়ে শাহজীবাজারে ১০০ মেগাওয়াট গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ
শুরু হয়। ২০২০ সালে এটি চালু হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। পরে
যখন পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়, তখনই ঘটে বিপত্তি—ভেঙে যায় টারবাইনের ব্লেড। এরপর
একাধিকবার মেরামত করা হলেও সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের
এপ্রিলে আবারও একই ত্রুটি দেখা দিলে কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইউনিটটি নিয়মিত চালু থাকলে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি টাকার
বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হতো। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত ছয় বছরে এটি মাত্র ৬৭ দিন
চালু ছিল। ফলে শুধু এই একটি ইউনিট থেকেই দেশের সম্ভাব্য ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪ হাজার
কোটি টাকা।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক এ কে মফিজউদ্দিন আহমেদ জানান, প্রকল্পের মোট বিলের প্রায় ৭০
শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়েছে। তবে
কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় বাকি ৯০ কোটি টাকা আটকে রাখা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন
দেশে এই টারবাইনটি সফলভাবে ব্যবহৃত হলেও এখানে কেন বারবার সমস্যা হচ্ছে, তা
বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে দেখছেন। তবে বর্তমানে মেরামতের কাজ চলছে এবং আগামী ২৭ জুনের
মধ্যে ইউনিটটি পুনরায় চালু করে জাতীয় গ্রিডে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করার আশা
করা হচ্ছে।
৩৩০ মেগাওয়াট প্রকল্প: উদ্বোধনের আগেই বড় ধাক্কা এদিকে, প্রায় ২ হাজার ৮০৯ কোটি
টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৩৩০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিস্থিতিও
বেশ নাজুক। উদ্বোধনের আগেই এর একটি প্রধান ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে যায়। সেই ধাক্কা
সামলে ওঠার আগেই ২০২২ সালের মে মাসে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আরও দুটি ট্রান্সফরমার
পুড়ে যায়। ফলে শুরুতেই থমকে যায় এর উৎপাদন কার্যক্রম।
বর্তমানে এই কেন্দ্রটির একটি মাত্র ইউনিট থেকে কোনোমতে ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট
বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দৈনিক প্রায় ৮ কোটি টাকার সাশ্রয় করছে।
কিন্তু বাকি ইউনিটগুলো বন্ধ থাকায় প্রতিদিন আরও ১৬ কোটি টাকার নিশ্চিত সাশ্রয় থেকে
বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান জানান, গত এক মাস ধরে একটি ইউনিট
সচল রাখা গেছে এবং বাকিগুলো চালুর চেষ্টা চলছে।
জাতীয় গ্রিডে চাপ বর্তমানে শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট ৪৯০ মেগাওয়াট উৎপাদন
ক্ষমতার বিপরীতে ৩টি আংশিক চালু ইউনিট থেকে মাত্র ১৮৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া
যাচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত এই কেন্দ্রের সবগুলো ইউনিট পূর্ণ
শক্তিতে সচল করা না গেলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে
দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর।





