শনিবার, ৯ই মে, ২০২৬, ২৬শে বৈশাখ, ১৪৩৩

অর্থনীতির নতুন ঝুঁকি, রেকর্ড ৩৫৩ ট্রিলিয়ন ডলারে বৈশ্বিক ঋণ

বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ এক ভয়াবহ উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির

স্থিতিশীলতাকে বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা

ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স (আইআইএফ) তাদের সর্বশেষ ‘গ্লোবাল ডেট

মনিটর’ প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, গত মার্চ মাস শেষে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ৩৫৩

ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গণমাধ্যম কোরিয়া হেরাল্ড-এর বরাতে

জানা গেছে, কেবল চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ যুক্ত

হয়েছে, যা ২০২৫ সালের মাঝামাঝির পর ঋণের দ্রুততম প্রবৃদ্ধি।

আইআইএফ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ঋণ বাড়ার পেছনে বিশ্বের দুই প্রভাবশালী অর্থনীতি—

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন প্রধান ভূমিকা পালন করছে। আমেরিকায় সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান

উল্লম্ফন অর্থনীতিবিদদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

(এআই) খাতের কারণে সেখানকার কর্পোরেট বন্ড বাজার এখনও সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে চীনে

আর্থিক খাতের বাইরের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক ঋণ গ্রহণের প্রবণতা দেশটির

সামগ্রিক ঋণের বোঝাকে আরও ভারী করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক

বিনিয়োগকারীরা এখন মার্কিন ট্রেজারি বন্ড থেকে সরে এসে জাপান ও ইউরোপীয় বাজারের

দিকে ঝুঁকছেন। আইআইএফ-এর পরিচালক এমরে টিফটিক এ প্রসঙ্গে বলেন যে, ৩০ ট্রিলিয়ন

ডলারের মার্কিন বন্ড বাজারে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি

‘অস্থিতিশীল’ পথে রয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির মোট উৎপাদনের তুলনায় ঋণের গড় অনুপাত বর্তমানে ৩০৫ শতাংশে

দাঁড়িয়েছে। নরওয়ে, কুয়েত, চীন, বাহরাইন ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে এই ঋণের বোঝা এক

বছরে ৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। আইআইএফ সতর্ক করেছে যে, প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়

বৃদ্ধি, জ্বালানি ও সাইবার নিরাপত্তা এবং দ্রুত বার্ধক্যের মতো কাঠামোগত পরিবর্তনের

কারণে ভবিষ্যতে ঋণের চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তিতে বিশাল বিনিয়োগের

জন্য দেশগুলোকে আরও বেশি মূলধনি ব্যয় করতে হবে।

এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য

‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এক

সতর্কবার্তায় জানিয়েছে যে, ভূরাজনৈতিক সংকট বজায় থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে

মোট সরকারি ঋণ জিডিপির ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা গত বছর ছিল ৯৪ শতাংশ। যুদ্ধের

ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের

চাপ দেশগুলোকে এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি ও যুদ্ধের দ্বিমুখী ব্যয়ের চাপে বিশ্ব এখন ঋণের

সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। বিশেষ করে আমেরিকার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের

ইঙ্গিত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক নতুন সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। করোনা

মহামারীর পর এক বছরে ঋণের এমন বিশাল উল্লম্ফন ইতিপূর্বে আর দেখা যায়নি, যা আগামী

দিনগুলোতে বিভিন্ন দেশের সরকারের জন্য অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং ঋণের বোঝা

নিয়ন্ত্রণ করাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন